বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

ভারতবর্ষে পরিসংখ্যানবিদ্যার চর্চায় জয়ন্ত কুমার ঘোষের অবদান

 ভারতবর্ষে পরিসংখ্যানবিদ্যার চর্চায় জয়ন্ত কুমার ঘোষের অবদান

-শুভাশিস ঘোষাল

 



কৃতী মানুষেরা বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে পরিচিতি লাভ করতে পারেন --- কেউ অভিনয়ে, কেউ খেলায়, কেউ সঙ্গীতে, কেউ সাহিত্যে, কেউ শিল্পকলায়, ইত্যাদি। তবে একজন রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, খেলোয়াড়, সঙ্গীতজ্ঞ, বা একজন সাহিত্যিকও যতটা পরিচিতি লাভ করেন, একজন বিজ্ঞানী সাধারণতঃ জনমানসে তাঁদের থেকে ঢের কম পরিচিতি পান, যদিও বিজ্ঞানীর গবেষণার প্রভাব চিরকালীন হতে পারে ও তার সুফল সমাজ বহুসময় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পেয়ে থাকে। এর একটা কারণ যদি হয় বিজ্ঞানীদের কাজে জনসংযোগের খুব একটা প্রয়োজন হয় না, তো অন্য কারণ হল বিজ্ঞানীদের কাজের দুরূহতা। আধুনিক বিজ্ঞান খুবই বিশেষায়িত। এক শাখার বিজ্ঞানীর পক্ষেও অন্য এক শাখার বিজ্ঞানীর কাজের মূল্যায়ন করা প্রায়ই অসম্ভব কাজ। তাই অনন্য প্রতিভা ও কৃতিত্বের অধিকারী হয়েও বিজ্ঞানীরা বেশিরভাগ সময়ই জনমানসে অপরিচিতই রয়ে যান। আইনস্টাইনের মতো ঘরে ঘরে পরিচিত নাম গুটিকয়েক ব্যতিক্রম। তবে তাতে বিজ্ঞানীদের সাধারণতঃ কোনো আক্ষেপ থাকে না --- তাঁদের কাজ করতে পারলেই তাঁরা খুশি থাকেন।

বাংলার নবজাগরণের সময় থেকে বাঙালি মননে ভারতবর্ষে প্রথম সারিতে থেকেছে। সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বহু বাঙালি বিজ্ঞানীর অবদান আন্তর্জাতিক মানদন্ডেও প্রথম শ্রেণির। নবজাগরণের প্রথম প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের মধ্যে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়, এবং তার পরের প্রজন্মে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা ও প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশেরা অতি পরিচিত নাম। কিন্ত এঁরা ছাড়াও অসংখ্য বাঙালি বিজ্ঞানী দেশেই গবেষণা করে বিজ্ঞানের নানা শাখায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। এঁদেরই একজন, পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত প্রয়াত পরিসংখ্যানবিদ অধ্যাপক জয়ন্ত কুমার ঘোষ।  

অধ্যাপক ঘোষ তাত্ত্বিক পরিসংখ্যানবিদ্যায় পৃথিবীর প্রথমসারির একজন গবেষক। তিনি দীর্ঘদিন বরাহনগরে ভারতের সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠানে (ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউট, সংক্ষেপে আই এস আই) অধ্যাপনা করেছেন, প্রতিষ্ঠানের  নির্দেশকও ছিলেন পাঁচ বছরের উপর। তিনি ছাত্র, সহকর্মী এবং বন্ধুদের কাছে প্রধানতঃ জেকেজি নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর অসাধারণ পান্ডিত্য, গবেষক হিসেবে বিপুল আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং স্বভাবসিদ্ধ সৌজন্যবোধের জন্য তিনি সর্বজনশ্রদ্ধেয় ছিলেন। আই এস আই তে (ও পরে পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে) তিনি প্রায় পঁয়ত্রিশজন ছাত্রছাত্রীর ডক্টরেট থিসিসের উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমান লেখকেরও তাঁর নির্দেশনায় গবেষণা করে থিসিস লেখার সুযোগ হয়েছে।  

জয়ন্ত কুমার ঘোষ (জেকেজি) ১৯৩৭ সালের ২৩শে মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম অম্বরনাথ ঘোষ এবং মায়ের নাম শান্তিলতা ঘোষ। দক্ষিণ কলকাতায় একান্নবর্তী পরিবারে অনেক তুতোভাইবোনদের সাথে একটি বিশাল বাড়িতে তিনি বড় হয়েছিলেন। পরে বহুবার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় তিনি সেই সুখী সময়ের কথা বলতেন।

জেকেজি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৫৬ সালে পরিসংখ্যানবিদ্যায়  সাম্মানিকসহ স্নাতক ন। এর পর তিনি ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। অসাধারণ মেধা ও উদ্ভাবনীশক্তির জন্য তিনি শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র ছিলেন। সহপাঠিরাও তাঁকে বিশেষ সমীহ করত। তবে লাজুক প্রকৃতির হলেও উষ্ণতা আর আন্তরিকতার কোনও অভাব তাঁর ছিল না। তাঁর কলেজ জীবনের বন্ধু অধ্যাপক রবি ভট্টাচার্য স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন, সহপাঠীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ওঁর সাথে সহজভাবে মেলামেশা করতে সাহস পেতেন। ১৯৬২ সালে অধ্যাপক হরিকিংকর নন্দীর তত্ত্বাবধানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেকেজি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর ডক্টরেট থিসিসের বিষয় ছিল পর্যায়ক্রমে নমুনা সংগ্রহে (sequential analysis) সবচেয়ে কম ত্রুটিপূর্ণ অনুমান পরীক্ষা (optimal hypothesis test) চিহ্নিত করা। পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করা নমুনা থেকে অনুমান পরীক্ষা করার পদ্ধতি বিখ্যাত মার্কিন গণিতজ্ঞ ও পরিসংখ্যানবিদ আব্রাহাম ওয়াল্ড আবিষ্কার করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রচুর সামরিক ও অসামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করার প্রয়োজন হয়েছিল। ওয়াল্ডের আবিষ্কার উৎপাদনের গুণমান পরীক্ষার পদ্ধতিকে ব্যাপক উন্নত করে মিত্রপক্ষকে যুদ্ধে জিততে সাহায্য করেছিল। ওয়াল্ড ও আর এক পরিসংখ্যানবিদ ওলফোউইটজ মিলে এই নতুন পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন, কিন্তু সেই প্রমাণ প্রযোজ্য ছিল শুধু যখন বিকল্প অনুমানে (alternative hypothesis) একটিমাত্র বিন্দু থাকে (simple hypothesis)। যৌগিক বিকল্প অনুমানের (composite alternative hypothesis) ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্ব তখনো প্রমাণ করা যায় নি। যুদ্ধ শেষ হবার পরে পরেই ভারতবর্ষ ভ্রমণে এসে দক্ষিণ ভারতে একটি মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় ওয়াল্ড প্রাণ হারান। জেকেজি তাঁর থিসিসে ওয়াল্ডের পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্ব আরও ব্যাপকার্থে প্রমাণ করেন।

জেকেজি ১৯৬২-১৯৬৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেনকিন্তু দু বছরের মধ্যেই ভারতবর্ষে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৬ সালে তিনি কলকাতা আই এস আইয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন ও ২০০২ সালে তাঁর অবসরগ্রহণ পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করেন । ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত তিনি আই এস আইয়ের পরিচালকের হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মহলানবীশের ভাবশিষ্য বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিসংখ্যানবিদ প্রয়াত অধ্যাপক সি আর রাওয়ের পর মূলতঃ ভারতবর্ষে কাজ করে গাণিতিক পরিসংখ্যানবিদ্যায় সুদূরপ্রসারী অবদান রাখা কারুর কথা ভাবতে হলে প্রথমে জেকেজির কথাই মনে হয়। ভারত সরকার তাঁকে জওহরলাল নেহরু অধ্যাপক পদে সম্মানিত করেছিল। অবসর নেবার পরও তিনি এমিরেটাস অধ্যাপক হিসেবে আই এস আইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং যতদিন কলকাতায় থাকতেন, নিয়মিত আই এস আই যেতেন ও সক্রিয় গবেষণায় অংশ নিতেন।  আই এস আই ছাড়াও জেকেজি নিয়মিতভাবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-বার্কলে এবং পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতেন ও সেখানে শিক্ষাদান ও গবেষণায় অংশ নিতেন১৯৯০ সাল থেকে তিনি বছরে একটি করে সেমেস্টার পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে পরিদর্শক অধ্যাপক হিসেবে কাজ করতেন এবং ১৯৯৭ থেকে সেখানে স্থায়ী অধ্যাপকের পদ পান। আই এস আই থেকে অবসরগ্রহণের পর তিনি পাকাপাকিভাবে পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতেন। গত দশকের মাঝমাঝি পার্ডু থেকে অবসর নিয়ে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অধ্যাপক এমেরিটাস পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

ইলিনয়ে থাকাকালীন জেকেজির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি প্রকাশ হয়, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে। কাজটি প্রকৃতপক্ষে থিসিস লেখার পর কলকাতায় থাকাকালীনই করা। জ্যাক হল ও রবার্ট ভাইসম্যানের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ হলেও তাঁরা তিনজনেই স্বাধীনভাবে গবেষণা করে প্রায় একই সময়ে একই ধরণের সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এই গবেষণাপত্রে তাঁরা দেখান পরিসংখ্যানবিদ্যায় রাশি সরলীকরণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি --- পর্যাপ্ততা (sufficiency) ও অপরিবর্তনীয়তা (invariance) --- ভিন্ন ক্রমে প্রয়োগ করলেও সাধারণতঃ পৃথক ফল হয় না, এবং একই ফল পাবার শর্ত কী তা তাঁরা চিহ্ণিত করেন। এই সিদ্ধান্তটির খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করা নমুনা থেকে অনুমান পরীক্ষা করার পদ্ধতির যথার্ততা প্রমাণ করতে, কারণ অপরিবর্তনীয়তা প্রয়োগ করার পর পর্যাপ্ততা প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয় কিন্তু আগে পর্যাপ্ততা প্রয়োগ করে পরে অপরিবর্তনীয়তা প্রয়োগ করা সুবিধাজনক। তাঁদের সিদ্ধান্তে প্রমাণ হয় নিশ্চিন্তে দ্বিতীয় পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে।

জেকেজি তাঁর গবেষক জীবনে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। সেগুলো সব এই স্বল্প পরিসরে গাণিতিক সূত্র এড়িয়ে সহজ করে বর্ণনা করা অসম্ভব। তবু কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রভাব ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বিখ্যাত ভারতীয় পরিসংখ্যানবিদ রঘুরাজ বাহাদুর পরিসংখ্যানবিদ্যায় অপরিহার্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাশি কোয়ান্টাইলের একটি কার্যকর প্রতিরূপ আবিষ্কার করেছিলেন। জেকেজি তার একটি অনুরূপ আবিষ্কার করেন, যেটা বাহাদুরের প্রতিরূপের থেকে সামান্য দুর্বল হলেও কম শর্তের অধীনেই প্রযোজ্য, এবং পরিসংখ্যানবিদ্যায় প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট। তাঁর এর পরের প্রধান উল্লেখযোগ্য কাজ হল ১৯৭৪ সালে ছাত্র কসালা সুব্রামান্যিয়ামের সাথে পরিসংখ্যানবিদ্যায় সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতি, সর্বাধিক সম্ভাবনার অনুমানকের (maximum likelihood estimator) দ্বিতীয় ক্রমের শ্রেষ্ঠত্ব (second order efficiency) প্রমাণ করা। এর আগে পর্যন্ত শুধু প্রথম ক্রমের শ্রেষ্ঠত্ব (first order efficiency) জানা ছিল। সেই কাজের সূত্র ধরে তিনি ১৯৭৮ সালে সহপাঠী আমেরিকাপ্রবাসী গবেষক রবি ভট্টাচার্যের সঙ্গে এজোওয়ার্থ সম্প্রসারণের (Edgeworth expansion) যথার্ততা প্রমাণ করে একটি গবেষণাপত্র লেখেন। এজোয়ার্থ প্রবর্তিত এই সম্প্রসারণ পরিসংখ্যানবিদ্যায় প্রচলিত বহু রাশির নিবেশনসূত্রের (probability distribution) আসন্ন মান (approximation) হিসেব করতে খুব উপযোগী, কিন্তু তার যথাযথ কোনো গাণিতিক প্রমান ছিল না। এই সময়ই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ ব্র্যাডলি এফ্রন পরিসংখ্যানবিদ্যার এক অপরিহার্য হাতিয়ার বুটস্ট্র্যাপ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে বুটস্ট্র্যাপ পদ্ধতির যথার্থতা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করতেও ভট্টাচার্য-ঘোষের এজোয়ার্থের সম্প্রসারণের উপর প্রতিপাদ্যটি বিশেষ উপযোগী হয়েছিল। সম্ভাবনা অনুপাত (likelihood ratio), ওয়াল্ড এবং রাওয়ের পরীক্ষা পদ্ধতির ক্ষমতার সূক্ষ্ম পার্থক্য করতেও জেকেজি এই প্রতিপাদ্যটি কাজে লাগান। এই গবেষণাগুলি প্রকাশ হবার পর ভারত সরকার ১৯৮১ সালে তাঁকে দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্মান শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কারে সম্মানিত করেন।

এর পরবর্তীকালে জেকেজি ১৭৬৩ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ ও দার্শনিক থমাস বেয়েসের বিখ্যাত সূত্রের ভিত্তিতে গড়া পরিসংখ্যানবিদ্যার বেয়েসীয় পদ্ধতির (Bayesian inference) প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন, খুব সম্ভবতঃ বেয়েসীয় পদ্ধতির জোরালো সমর্থক প্রয়াত অধ্যাপক দেবব্রত বসুর যুক্তি হৃদয়ঙ্গম করে। অবশ্য জেকেজি মূলতঃ বস্তুগত বেয়েসীয় পদ্ধতির (objective Bayesian analysis) প্রবক্তা ছিলেন, অধ্যাপক বসুর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাশীল হয়েও তাঁর মতো আত্মবাদী বেয়েসীয় পদ্ধতির (subjective Bayesian analysis) দিকে ঝোঁকেন নি। বস্তুগত বেয়েসীয় পদ্ধতির প্রতি আকর্ষণের ফলশ্রুতিতে তাঁর বেশ কিছু গবেষণা বের হয় সম্ভাবনা মিলকারী পূর্বতন নিবেশনের (probability matching prior distribution) উপর, যা মূলতঃ পুনরাবৃত্তিক সংখ্যাতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত (frequentist statistical inference) ও বেয়েসীয় পদ্ধতিকে মেলানোর চেষ্টা। পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ জিম বার্গারও এই মিলন প্রচেষ্টায় সামিল ছিলেন ও তাঁরা দুজনে পরষ্পরের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ পিটার বিকেলের সঙ্গে লেখা এক গবেষণাপত্রে সম্ভাবনা অনুপাত পরীক্ষার (likelihood ratio test) বার্টলেট সংশোধনীর বেয়েসীয় ব্যাখ্যান দিতেও তিনি ভট্টাচার্য-ঘোষ প্রতিপাদ্য ব্যবহার করেছিলেন।

আমি ১৯৯০ সালে আই এস আইতে এম স্ট্যাট পাশ করার পর জেকেজির নির্দেশনায় ডক্টরেট গবেষণা শুরু করি। পশ্চাদবর্তী নিবেশন (posterior distribution), যা কিনা দৃশ্যমান রাশির মান দেখতে পাবার পর অদৃশ্যমান রাশির মানের মূল্যায়ণ নির্দিষ্ট করে, তা কী শর্তের সাপেক্ষে স্থিতিশীল হয় আমরা চিহ্ণিত করি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি জেকেজি ননপ্যারামেট্রিক বেয়েসীয় পদ্ধতির উপর কাজ শুরু করেন। প্রথমে ছাত্র তথা বন্ধু আর ভি রামমূর্তির সঙ্গে একটি গবেষণাপত্র লেখেন। ইতিমধ্যে আমি থিসিসের কাজ শেষ করলে পরবর্তী গবেষণায় তাঁরা আমাকে সামিল করে নেন। ননপ্যারামেট্রিক বেয়েসীয় পদ্ধতিগুলি খুবই স্থিতিস্থাপক ও উপযোগী পদ্ধতি, কিন্তু সেগুলির গাণিতিক ধর্ম সম্বন্ধে খুব কমই জানা ছিল। অধ্যাপক ঘোষের কাছেই আমি সেইসব প্রশ্নের গুরুত্ব সম্বন্ধে অবহিত হই। সেই সময় বেশ কয়েকবছর আমরা পরপর কয়েকটি গবেষণাপত্র লিখি। এর মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল নিবেশনের ঘনত্ব অনুমানে (density estimation) খুবই কার্যকারী বেয়েসীয় পদ্ধতি ডিরিচলে মিশ্রণের (Dirichlet mixture prior) পশ্চাদবর্তী নিবেশন অভিসৃতি (posterior consistency) গাণিতিকভাবে প্রমাণ করা।

নব্বই দশকের শেষদিকে আমস্টার্ডামে বিশিষ্ট ডাচ পরিসংখ্যানবিদ আদ ফন দের ফার্তের (Aad van der Vaart) কাছে আমি ডক্টরেট পরবর্তী গবেষণা করার সুযোগ পাই। জেকেজির সঙ্গে আমার তৎকালীন গবেষণার বিষয় আদের সঙ্গে  আলোচনা করাতে উনি খুবই আগ্রহ অনুভব করেন। আদ এর আগে পর্যন্ত কোনও বেয়েসীয় বিষয়ের উপর গবেষণা করেন নি, তবে এর পর আমরা তিনজন একযোগে কাজ শুরু করে পশ্চাদবর্তী নিবেশনের অভিসৃতির গতি (posterior convergence rate) নির্ণয় করার সাধারণ সূত্রগুলোকে চিহ্নিত করি। আমি আমস্টার্ডামে থাকাকালীন আদের আমন্ত্রণে গবেষণার জন্য জেকেজি একবার আমস্টার্ডামে এসেওছিলেন। আমাদের গবেষণার ফলে বিভিন্ন ননপ্যারামেট্রিক বেয়েসীয় পদ্ধতির অভ্রান্ততার মাত্রা গাণিতিকভাবে বোঝা সম্ভব হয়। এর পর আমি আমেরিকায় অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে চলে গেলেও আদের প্রভাবে নেদারল্যান্ডস অচিরেই ননপ্যারামেট্রিক বেয়েসীয় পদ্ধতিগুলির গাণিতিক ধর্ম অনুসন্ধানের একটা প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ডাচ বিজ্ঞানীরা এখনও দেখা হলে আমাকে নেদারল্যান্ডসে ননপ্যারামেট্রিক বেয়েসীয় চর্চায় অনুঘটকের কাজ করার জন্য ধন্যবাদ দেন, তবে এই বিষয়ে গবেষণার মূল প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব আমি জেকেজির কাছ থেকেই জেনেছিলাম।

২০০২ সালে আই এস আই থেকে অবসরগ্রহণের পর জেকেজি পাকাপাকিভাবে পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে যৌথ গবেষণা তারপর আর খুব বেশি করা হয় নি আমার। এই সময় জেকেজি মূলতঃ বস্তুগত বেয়েসীয় মডেল নির্বাচন পদ্ধতির (objective Bayesian model selection), বেয়েসীয় বহুবিধ পরীক্ষা পদ্ধতি (Bayesian multiple hypothesis testing) এবং আর কিছু বিষয়ের উপর বেশ কিছু গবেষণাপত্র লেখেন।

মূলতঃ বিমূর্ত গাণিতিক পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ হলেও ব্যবহারিক পরিসংখ্যানবিদ্যায়ও জেকেজির অপরিসীম আগ্রহ ছিল। পরিসংখ্যানগত মান নিয়ন্ত্রণ, খনিজ তেলের আবিষ্কারে পরিসংখ্যানবিদ্যার প্রয়োগ, ভূতাত্ত্বিক ম্যাপিং, জিনোমিক্স এবং ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং-এ বেশ কিছু প্রয়োগিক কাজে তিনি অংশ নেন ভারতের সরকারী পরিসংখ্যান ব্যবস্থার প্রতিও তার গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার জন্য ভালো তাৎক্ষনিক সমাধানকে মূল্য দিতেন। তিনি বলতেন, তত্ত্বটি পরে আসবে। তিনি বুদ্ধের উক্তি উদ্ধৃত করতেন, "যখন একজন মানুষ বিষাক্ত তিরে আহত হয়, তখন কেউ জিজ্ঞাসা করে না যে এটি নিক্ষেপকারী ব্যক্তির নাম এবং বংশ কী; ধনুকটি লম্বা ধনুক ছিল নাকি ক্রসবো; তিরের ডগা বাঁকা না কাঁটাযুক্ত। তখন একমাত্র উদ্বেগ হল তিরটি অপসারণ করা"।

জেকেজি বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। তার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল আর ভি রামমূর্তির সঙ্গে লেখা ‘বেয়েসিয়ান ননপ্যারামেট্রিক্স’। এই বইটি ২০০৩ সালে স্প্রিংগার-ভারলাগ প্রকাশ করে। এই বইতেই প্রথম  ননপ্যারামেট্রিক বেয়েসীয় পদ্ধতিগুলির গাণিতিক ধর্ম একটা বইয়ের আকারে সংকলন করা হয়েছে, যা আগে শুধু বিভিন্ন গবেষণাপত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এর পরে অধ্যাপক মোহন দেলাম্পাদি ও তাপস সামন্তের সঙ্গে বেয়েসীয় পদ্ধতির উপর একটি পাঠ্যপুস্তক তিনি লিখেছিলেন। এ ছাড়া উচ্চক্রমের অ্যাসিম্পটটিক্সের উপর লেখা একটি পুস্তিকা তিনি লিখেছেন এবং দুটি বই সম্পাদনা করেছেন --- একটি দেবব্রত বসুর কয়েকটি গবেষণাপত্রের সংকলন, এবং অপরটি ভারতের পরিসংখ্যানবিদ্যার ঐতিহ্যের উপর। ১৯৮৮-১৯৯৯ এই দীর্ঘ সময় তিনি মহলানবীশ প্রবর্তিত পরিসংখ্যানবিদ্যার ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার ‘সংখ্যা’র সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন

জেকেজি তাঁর জীবনে অসংখ্য পুরষ্কার এবং সম্মান পেয়েছেন এর মধ্যে ১৯৮১ সালে প্রাপ্ত ভাটনগর পুরস্কার, এবং ২০১৪ সালের পদ্মশ্রী খেতাবের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এ ছাড়া ১৯৯৮ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের দেওয়া মহলানবীশ স্বর্ণপদক, ২০০০ সালে পি.ভি. সুখাত্মে পুরস্কার এবং ২০১০ সালে ইন্টারন্যাশানাল ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সম্মাননা পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন। তিনি ইনস্টিটিউট অফ ম্যাথামেটিকাল স্ট্যাটিসটিক্স, ভারতের জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি এবং ইন্টারন্যাশানাল সোসাইটি ফর বেয়েসিয়ান অ্যানালিসিসের ফেলো ছিলেন। তিনি ১৯৯৩-১৯৯৫ সালে রাশিবিজ্ঞানীদের বৃহত্তম সংস্থা ইন্টারন্যাশানাল স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটের সভাপতি নির্বাচিত হন। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের পরিসংখ্যান বিভাগের সভাপতি দায়িত্বও তিনি পালন করেছিলেন এক বছর। ২০১২ সালে আইএসআই থেকে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অফ সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করা হয়। তিনি জীবনে গবেষণা সংক্রান্ত বহু বক্তৃতা দিয়েছেন, যার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৯৮ সালে ইন্টারন্যাশানাল কংগ্রেস অফ ম্যাথামেটিসিয়ানে বক্তৃতার আমন্ত্রণ পাওয়া। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে খুব কম ক্ষেত্রেই পরিসংখ্যানবিদরা গণিতের এই বিশাল সম্মেলনে বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ পান।   

জেকেজি ছাত্রছাত্রীদের সন্তানের মতই স্নেহ করতেন এবং তাদের সর্বতোপায়ে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। পার্ডুতে থাকার সময় বেশ কিছু ছাত্রকে তিনি তাদের আমেরিকায় থাকার শুরুর সময় তাঁর নিজের বাড়িতেই থাকতে দিতেন। ছাত্রছাত্রীদের কোনও গবেষণাপত্রে তিনি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা না নিলে নিজের নাম দিতেন না। ক্লাসে পড়ানোর সময় পুঁথিগতবিদ্যার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে বিষয়ের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। তাছাড়া, তিনি পড়ানোর সময় অত্যাধুনিক গবেষণার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৩ সালে স্নাতোকত্তরে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের তিনি ১৯৭৯ সালে প্রস্তাবিত (এবং ১৯৮১ সালে গাণিতিকভাবে চর্চিত) বুটস্ট্র্যাপ পদ্ধতি পড়িয়েছিলেন।  আই এস ইয়ে তিনি সংযত প্রকৃতির ছিলেন, কিন্তু মানুষকে সহায়তা দিতে কখনও পিছপা হতেন না। শুধু ছাত্রছাত্রী বা সহ-গবেষকরা নন, যে কেউ তার অফিসে এসে প্রযুক্তিগত বা ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। তিনি কোনও প্রত্যাশা ছাড়াই যথাসম্ভব সাহায্য করতেন। সেজন্য তিনি যেমন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ছিলেন, তেমনই অনেকেই অবাস্তব প্রত্যাশাও করত যে সব সমস্যাই তিনি মিটিয়ে দেবেন। আই এস ইয়ের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জেকেজি সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। আই এস আই সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান হবে যেখানে পরিসংখ্যানবিদরা তাঁদের নিজস্ব বিষয়ে গবেষণা করার পাশাপাশি পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং শ্রদ্ধার পরিবেশে অন্যান্য বিষয়ের বিজ্ঞানীদের সাথে সহযোগিতা করবেন। তিনি আই এস আইতে শুধুমাত্র পরিসংখ্যানবিদ্যার নেতৃত্বই দেননি --- গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ববিদ্যা এবং অর্থনীতি বিভাগের বিকাশেও সহায়তা করেছেন। অবসর গ্রহণের পরও তিনি আই এস আইয়ের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গবেষণায় সহযোগিতা রক্ষায় গভীর আগ্রহী ছিলেন।

জেকেজির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা প্রায়শই তাঁর পাণ্ডিত্যের কথা বলেন, কেবল পরিসংখ্যান এবং গণিতেই নয়, সাহিত্য, ইতিহাস এবং দর্শন সহ আরও অনেক বিষয়েও। তিনি শৈশব থেকেই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং একজন আগ্রহী পাঠক হয়ে ওঠেন। তিনি ব্যাপকভাবে ইতিহাস, সাহিত্য এবং কল্পকাহিনী পড়তেন। বাংলা এবং ইংরেজি চিরায়ত সাহিত্যে তাঁর খুবই ব্যুৎপত্তি ছিল। মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথ, টি এস এলিয়ট বা সেরকম কোনও বিখ্যাত লেখক বা কবির লেখার থেকে উপযুক্ত উদ্ধৃতি দিয়ে পরিস্থিতি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করতেন। তিনি খুব একটা ধার্মিক ছিলেন না কিন্তু ধর্মীয় গ্রন্থ যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। জীবনের শেষের দিকে তিনি শিশুদের বই পড়ে বেশি আনন্দ পেতেন।

জেকেজির মধ্যে বৌদ্ধিক কৌতূহল জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর কাকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিজ্ঞান ও সমাজের বিস্তৃত প্রশ্নগুলিতে জেকেজি গভীর আগ্রহী ছিলেন। তিনি লিখেছেন ``আমরা যখন এক শতাব্দীর দিকে ফিরে তাকাই এবং অন্য শতাব্দীর জন্য প্রস্তুতি নিই, তখন আমরা যে বিরাট পরিবর্তনগুলি ঘটছে সে সম্পর্কে সচেতন না হয়ে পারি না। এর মধ্যে একটিকে গণতন্ত্রীকরণ বলা যেতে পারে, যার ফলে নতুন জাতি এবং জাতির মধ্যে নতুন গোষ্ঠীর ভোটাধিকার লাভ হয়। অন্য ধরণের পরিবর্তন আসলে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব, যার মূল উপাদানগুলি ছিল তথ্য উৎপাদন, বিপণন এবং ব্যবহার, প্রায়শই খুব ইন্টারেক্টিভ উপায়ে। যদি এই আন্দোলনগুলি দীর্ঘ সময়ের জন্য তাদের বর্তমান গতি বজায় রাখে, তাহলে ভবিষ্য আমাদের অভ্যস্ত থেকে অনেক আলাদা হবে এবং সমস্ত পরিবর্তন সহজ হবে না। অনেক দক্ষতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে এবং গণতন্ত্রীকরণের জন্য নতুন স্তরের আত্ম-শৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের সহনশীলতার প্রয়োজন হবে। পরিবর্তনশীল বিশ্বে টিকে থাকার এবং সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য নতুন মূল্যবোধ এবং দক্ষতার প্রয়োজন হবে। আমরা ভবিষ্যৎকে কীভাবে গ্রহণ করি তার উপর নির্ভর করে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হতাশাজনক বা ভীতিকর অভিজ্ঞতার পরিবর্তে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।" আজকে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নানা পেশায় নিযুক্ত মানুষের বিকল্প হয়ে উঠছে, তখন জেকেজির দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে তাঁর এই বক্তব্যে।

দয়া এবং করুণা জেকেজির স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ছিলকারুর সত্যিকারের সাহায্য দরকার হলে প্রয়োজনে তিনি নমনীয় হতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নিয়মগুলি মানুষকে সাহায্য করার জন্য তৈরি করা হয়, তাদের সীমাবদ্ধ করার জন্য নয়। আই এস আইয়ের পরিচালক হিসেবে এই জন্য তিনি কখনও কখনও সমালোচিত হন, তবে তা তিনি উপেক্ষা করেছিলেন। তিনি ভিন্নমতকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন, এমনকি উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত বিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন যাদের প্রতি তাঁর গভীর স্নেহ ছিল। অসন্তুষ্ট হলেও তিনি একে এককালীন বিচ্যুতি হিসাবে গণ্য করতেন এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ চালিয়ে যেতেন। তিনি প্রায়শই বলতেন যে "আমি সহজেই বিরক্ত হই কিন্তু রাগ না করার চেষ্টা করি"। তিনি আনুষ্ঠানিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন না।  তরুণ ছাত্রছাত্রীদের থেকে বিধিবৎ অধ্যাপক সম্বোধনের চেয়ে জেকেজি সম্বোধন বেশি পছন্দ করতেন। আর ছিল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাস্যরস। একবার জাপান ভ্রমণের পর আই এস আই-তে ফিরে এলে চায়ের টেবিলে কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি জাপানি পড়তে পারেন কিনা। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, "হ্যাঁ", একটু পরে যোগ করেছিলেন, "যদি তা ইংরেজিতে লেখা হয়"।

জেকেজির কলকাতা শহরের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা ছিল। আই এস ইয়ের প্রতি এই ভালোবাসাও ছিল তার দুর্বলতা, কারণ তিনি নিজেকে এর থেকে দূরে রাখতে পারতেন না; এবং এর ফলে কিছু দুঃখজনক মুহূর্তও তৈরি হয়েছিল। শেষের দিকে, তিনি তাঁর শহরে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, তার অসুস্থতার পরিস্থিতি তাকে তা করতে দেয়নি। শেষদিকে তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন --- হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, বুকে জল জমছিল যেটা পাম্প করে বের করে দিতে হচ্ছিল। পশ্চিম লাফিয়েতের (যেই শহরে পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত) একটা নার্সিং হোমে (আমেরিকায় নার্সিং হোম বলতে পরিচর্চার কেন্দ্র বোঝানো হয় --- মূল চিকিৎসা শুধু হাসপাতালে হয়) তাঁর শুশ্রূষা চলছিল। রামমূর্তি আমাকে জানালেন যে জেকেজি খুবই অসুস্থ, মাথাও ভালোভাবে কাজ করছে না, পারলে একবার দেখতে যেও। আমি গেলে আমাকে দেখে চিনতে পেরেছিলেন, তবে বেশিক্ষণ চোখ খুলে রাখতে পারে নি। আমি তাঁকে দেখে আসার এক সপ্তাহ পরে, ২০১৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর, আশি বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। আমেরিকার গ্রিনকার্ড থাকলেও মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ভারতবর্ষেরই নাগরিক ছিলেন।

জেকেজির জীবনের কোনও আলোচনাই তাঁর স্ত্রী ইরা দেবীর কথা উল্লেখ না করে সম্পূর্ণ হবে না। তিনি ছিলেন তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি। ইরাদি জেকেজির সব দেখাশুনো করতেন, যত্ন নিতেন, সামাজিক বাধ্যবাধকতার খেয়াল রাখতেন যাতে দৈনন্দিন ব্যাপারে জেকেজির মাথা ঘামাতে না হয়ইরাদি বই পড়তে এবং বাগান করতে ভালোবাসতেন। নিজে রান্না করে বন্ধুদের আপ্যায়ন করতে পছন্দ করতেন। জেকেজির জীবনের শেষ মাসগুলিতে ইরাদির ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যবশত, ইরাদি নিজেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হনক্যান্সারের চতুর্থ পর্যায়ে রোগ ধরা পড়ার পর খুব বেশিদিন বাঁচার আশা ছিল না, তবু অদম্য প্রাণশক্তিতে যতটা সম্ভব হাসিখুশি থাকতেন। শেষে নার্সিং হোমের ঘরে জেকেজির পাশের বিছানাতেই তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। স্বামী মারা যাওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ইরাদি মারা যান --- মাথা ঠিকমত কাজ না করায় জেকেজি সেকথা বুঝতেও পারেন নি বুঝলে সাঙ্ঘাতিক কষ্ট পেতেন।

ঘোষ দম্পতির দুই ছেলেমেয়েই কৃতী। ছেলে বড়, আমেরিকার অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক। মেয়ে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানবিদ্যার অধ্যাপক। দুঃখের বিষয় জেকেজির স্মৃতিবিজড়িত ওঁর ভবানীপুরের বাড়িটি  (সেই বাড়িতে অনেকসময় ছাত্রছাত্রীদের নিমন্ত্রণ করে ওঁরা খাওয়াতেন এবং সেখানে আমারও যাবার সৌভাগ্য হয়েছে) অসাধু প্রমোটারের হাতে পড়ে জেকেজির বৈধ উত্তরাধিকারীদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। প্রমোটার কাজ শেষ না করে চলে যাওয়ায় তাঁর ছেলেমেয়েরা প্রতিশ্রুত ফ্ল্যাট বা অর্থ কিছুই পান নি। আমেরিকা থেকে এসে এসে মামলা করা সম্ভব নয় বলে তাঁরাও আর চেষ্টা করেন নি।

জেকেজি একজন মানবতাবাদী ছিলেন তিনি যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনায় বিশ্বাস করতেন, কিন্তু একই সাথে তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং করুণার মূল্য দিতেন। তিনি এমন একটি জীবনযাপন করেছিলেন যা এই বিশ্বাসগুলিকে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত করে। তার মধ্যে ছিল এক উষ্ণ আন্তরিকতা। তাঁর সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে, তাদের সকলের জীবনকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন

-------------------------------------------

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা "শিক্ষাদর্পণ" এর ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত।