রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

আমেরিকার ২০২৪ এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বাভাস

 আমেরিকার ২০২৪ এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বাভাস

-শুভাশিস ঘোষাল




এই রিপোর্টটা লেখার সময় থেকে আমেরিকায় ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আর দুই মাসও পুরো বাকি নেই। আইনসভার আর অন্যান্য বহু পদের জন্য নির্বাচন হলেও সবার দৃষ্টি মূলতঃ রাষ্ট্রপতি পদের দিকে। এবারে নানা কারণে একেবারে নাটকীয় পরিস্থিতি।

চার বছর আগে কোভিডের তুঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন নির্বাচিত হন। তাঁর সঙ্গে উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কমলা হ্যারিস। তখনই বাইডেনের বয়স ৭৮ বছর ছিল।  তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন পরের নির্বাচনে তিনি আর লড়বেন না যাতে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কোনো ডেমোক্র্যাট তাঁর জায়গায় প্রার্থী হতে পারেন। সাধারণভাবে ধারণা ছিল যে পরাজিত হবার পর ডনাল্ড ট্রাম্প আর রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না, অন্য কোনো রিপাবলিকান তাঁর জায়গা নেবেন, পরাজিত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প আদালতে নির্বাচনের ফলকে উলটে দেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হবার পর নানা অবৈধ উপায়ে চেষ্টা চালান,  নির্বাচন শংসাপত্র দেওয়া ভন্ডুল করতে একদল উগ্র সমর্থককে উসকে আইনসভার উপর হামলা করান। সেই চেষ্টা রুখে দেওয়া গেলে হোয়াইট হাউস ছাড়ার আগে বেশ কিছু গোপনীয় সরকারি  নথি বেআইনিভাবে সঙ্গে করে নিয়ে যান। নানা টানাপোড়েন তদন্তের পর গতবছর ট্রাম্পকে সরকারিভাবে আদালতে অভিযুক্ত করা হয় মোট চারটি আলাদা অভিযোগে ৮৮টি আলাদা ধারায়। তার মধ্যে ২০১৬ নির্বাচনের আগে স্টর্মি ড্যানিয়েলকে মুখ বন্ধ রাখতে ঘুষ দেবার অভিযোগ ও সেই সূত্রে নির্বাচনী প্রচারের বিধি লঙ্ঘন সংক্রান্ত অভিযোগে নিউ ইয়র্কের আদালতে ৩৪ টি ফেলোনি অপরাধ ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। এ ছাড়াও যৌন হেনস্থা ও ব্যবসায় কারচুপির অপরাধে ট্রাম্প অর্থদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। এইরকম কারুর কোনো প্রধান দলের হয়ে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়া অভূতপূর্ব ঘটনা। অভিযোগগুলো যে আসছে জানাই ছিল। ট্রাম্পও বহুদিন আগের থেকেই ঘোষণা করে দেন তিনি আবার রিপাবলিকান দলের রাষ্ট্রপতিপদে প্রার্থী হতে চান। তবে তার জন্য তাকে দলের মধ্যে প্রাইমারিস্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। প্রাইমারি শুরুর আগে এক সময় মনে হচ্ছিল ফ্লোরিডার উগ্র দক্ষিণপন্থী গভর্নর রন ডি’স্যান্টিসের দিকে পাল্লা ভারি হচ্ছে, বড় কর্পোরেট সমর্থকরাও তাঁকেই টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু ক্যারিসমার অভাবে সেই জায়গা তিনি ধরে রাখতে পারেন নি। প্রাইমারিস্তরে একমাত্র ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাউথ ক্যারোলাইনার প্রাক্তন গভর্নর ও রাষ্ট্রপুঞ্জে আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি কিছুটা লড়াই দেন, তবে তা কখনই যথেষ্টর কাছাকাছিও ছিল না। ট্রাম্প সহজেই প্রাইমারি জেতেন। তবে তা সত্ত্বেও রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশের ট্রাম্পকে সমর্থন করায় অনীহা দেখায়। এমনকি ট্রাম্পকে সমর্থন করে নিকি হেলি সরে দাঁড়ানোর পরেও তাঁকে সমর্থন করা ভোটারদের একটা দল প্রকাশ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন জানাবে বলে জানায়।

উল্টোদিকে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাইডেন আবার ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হবেন জানানোয় (সম্ভবতঃ ট্রাম্প প্রার্থী হচ্ছেন দেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার আগের ঘোষণা থেকে তিনি সরে আসেন কারণ তিনি মনে করেছিলেন ট্রাম্পকে হারাতে ভোটারদের যে কোয়ালিশন গড়ে তোলার দরকার তাতে তাঁকে নেতৃত্বে দরকার হবে) উল্লেখযোগ্য ডেমোক্র্যাটদের কেউই প্রাইমারিতে দাঁড়ান নি। প্রাইমারিতে সব রাজ্য থেকেই বাইডেন প্রায় সমস্ত ভোট পান, অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটিক দলের ভোটাররা এককাট্টা হয়ে বাইডেনকেই সমর্থন করেন। বাইডেন সহজেই ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থীপদে মনোনয়ন পাবার প্রয়োজনীয় ভোট পেয়ে যান। অবশ্য আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে দলের অগস্ট মাসের সম্মেলন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাইডেন-ট্রাম্প রিম্যাচের দিকে এগোচ্ছিল।

কিন্তু প্রায় সমস্ত সমীক্ষাতেই দেখা গিয়েছিল, রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট-ইন্ডিপেন্ডেন্ট নির্বিশেষে বিরাট অংশের ভোটার এই রিম্যাচটা চুড়ান্ত অপছন্দ করছে। প্রত্যাক্ষ্যাত প্রার্থী ট্রাম্পের ব্যাপারে সেই মনোভাব থাকাই স্বাভাবিক, কিন্তু ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি (যিনি দ্বিতীয়বারের স্বাভাবিক প্রার্থী) হলেও বাইডেনকে লোকে আবার প্রার্থী চাইছে না। এর একটা বড় কারণ হল বাইডেনের বয়স প্রায় বিরাশি বছর। আরও চারবছর পরে মেয়াদ শেষ করার সময় তাঁর বয়স হবে ছিয়াশি। এত বৃদ্ধ কেউ রাষ্ট্রপতি হন নি কখনো --  তাছাড়া বাইডেনের স্মৃতিভ্রংশ হওয়া, মানসিক ক্ষমতার ক্ষয় নিয়ে লোকে চিন্তিত। ট্রাম্পও বাইডেনের কাছাকাছি বয়সী এবং এই দুই সমস্যা তাঁরও প্রকট, তবে রিপাবলিকান দলের আর সংবাদমাধ্যমের লাগাতার প্রচার বাইডেনের সমস্যার দিকেই বেশিরভাগ সময় আঙুল তুলেছে, ট্রাম্পের ভুলগুলোকে তেমনভাবে চিহ্ণিত না করে। এ ছাড়া বাইডেনের জনপ্রিয়তাতে অনেকদিন ধরেই ভাঁটা চলেছে। কোভিডের পর নানা সমস্যায় বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। অনেক মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে তাঁরা সমস্যায় পড়েছেন  এবং তাঁরা সেজন্য বাইডেনের উপর রুষ্ট হয়েছেন, যদিও বেশিরভাগ উন্নত দেশের থেকে আমেরিকার মূল্যবৃদ্ধি বেশি নয়, দেশের গড় বৃদ্ধির হারও বেশি আর বেকারত্ব কম। রিপাবলিকানরা সংবাদমাধ্যমে  সফলভাবে প্রচার করতে পেরেছেন যে দেশের অর্থনীতি রসাতলে গেছে। আর মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে লাখে লাখে লোক বেআইনিভাবে ঢুকে পড়ছে বাইডেন সরকারে ঔদাসীন্য বা মদতে, এমন একটা প্রচার ব্যাপকভাবে সফল হয়েছে। সীমান্ত সংক্রান্ত প্রচার সব দেশেই দক্ষিণপন্থীদের একটা বিরাট অস্ত্র। এ ছাড়া রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ও হালে গাজা ভূখন্ডে যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক ঘটনা বাইডেনের বিশেষ অসুবিধা সৃষ্টি করেছে। ফলে দেখা যাচ্ছিল গত বছর থেকে শুরু করে বেশিরভাগ সময় ভোটার সমীক্ষায় বাইডেন ট্রাম্পের থেকে পিছিয়ে থাকছিলেন। সেটা মানে অবশ্য নিশ্চিত হার হবার মতো কিছু নয়। তার কারণ ভোটারদের মত বদলাতেই থাকে। এই বছর থেকে মূল্যবৃদ্ধির হার অনেক কমে আসায়, অর্থনীতির বৃদ্ধির হার টানা ভাল থাকায় আর বেকারত্বের হার খুব কম থাকায় এমনকি ফক্স নিউজের মতো রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থী টেলিভিশন চ্যানেলেও স্বীকার করা হয় যে অর্থনীতির হাল যথেষ্টই ভালো। একটা ভালো অর্থনীতিতে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতির হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ভোটের সময় এলে লোকে স্থিতাবস্থার পক্ষেই ভোট দেয়। তা ছাড়া ট্রাম্পের নিজেরও সমস্যা প্রচুর। রিপাবলিকান ভোটারদের একটা বড় অংশ জানিয়েছিল যে ট্রাম্প যদি আদালতে দোষী প্রমাণিত হন, তাহলে তাঁকে সমর্থন করা সম্ভব নয়। সেইসব মানুষদের একটা ক্ষুদ্র ভগ্নাংশও যদি তাঁদের মতে অনড় থাকেন, সেক্ষেত্রে ট্রাম্পের জেতা কঠিন। তার কারণ গত নির্বাচনের ভিত্তিতে ট্রাম্প পিছিয়ে থেকে শুরু করছেন। তাঁকে যারা আগে ভোট দিয়েছেন, সেইসব ভোটারদের তাঁর ধরে রাখতে হবে, আর কিছু নতুন ভোটার জোগাড় করতে হবে। এক যদি না বাইডেন ব্যাপকভাবে তাঁর নিজের ভোটারদের হারান। ট্রাম্প যেহেতু খুবই বিভাজনকারী রাজনীতিক,  যারা আগে তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, তাদের নিজের দিকে টানা কঠিন। ফলে তাঁকে দ্বিতীয় সম্ভাবনার উপরেই নির্ভর করতে হতো। কিন্তু বাইডেনকে আগে ভোট দিয়েছেন এমন ভোটার যিনি ভেবেছেন বাইডেনকে আবার সমর্থন করবেন না, ভোটের সময় এলে তিনি হয়তো বাইডেনকেই ভোট দিতে পারেন, যদি তার ক্ষোভ কিছু প্রশমিত হয়।  সেইরকম ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছিল এই বছরের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ, বাইডেনের জোরালো স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণের পরে পরে। বাইডেন ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে ফেলে অনেক সমীক্ষায় এগিয়েও গেছিলেন। সেই মুহুর্তে ভেবে নেবার যথেষ্ট কারণ ছিল যে তারপর বাইডেন ক্রমশঃ এগিয়ে গিয়ে পুনর্নিবাচিত হয়ে যাবেন, যেমন আগে বহুবার এইভাবে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতিরা শেষ পর্যন্ত জিতে গিয়েছেন।

কিন্তু বাইডেনের বৃদ্ধত্বের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ট্রাম্পও যে প্রায় একইরকমের বৃদ্ধ, এমনকি স্থুলতার কারণে আরও অনেকবেশি আনফিট, সেটা ভোটারদের তেমন নজরে আসে না, কারণ ট্রাম্পের সমর্থকরা সাধারণতঃ সমর্থনের ব্যাপারে বেশি এককাট্টা। অন্যদিকে বাইডেনের বাচনভঙ্গির মধ্যে জোর বা নাটকীয়তার অভাব তাঁর একটা দুর্বলতা। এই সমস্যার চুড়ান্ত প্রভাব পড়ে জুনের শেষে প্রথম আনুষ্ঠানিক বিতর্কে। এমনিতে বিতর্কের খুব একটা প্রভাব ভোটারদের উপর পড়ে না, কিন্তু বাইডেনের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল তিনি যে আরও চারবছর রাষ্ট্রপতির কাজ করতে সক্ষম, সেটা প্রতিপন্ন করা। সেদিনের বিতর্কে বাইডেন মারাত্মক খারাপ পারফর্মেন্স করেন। ট্রাম্প মূল প্রশ্ন এড়িয়ে টানা মিথ্যাচার করে গেলেও বাইডেন তাঁকে প্রতিহত করতে অপারগ হন। এর আগে পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট দলের একটা অল্প অংশ ছাড়া ভোটার সমীক্ষার ফল নিয়ে তেমন কেউ চিন্তিত হন নি, কিন্তু এর পর আস্তে আস্তে অনেকেই বাইডেনের জেতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে সংশয় প্রকাশ করতে থাকেন।

ইতিমধ্যে জুলাইয়ের তেরো তারিখে পেনসিল্ভ্যানিয়া রাজ্যের বাটলার শহরে জনসভা করতে গিয়ে ট্রাম্পের উপর এক বন্দুকবাজের হামলা হয়। ট্রাম্প অল্পের জন্য বেঁচে যান – বুলেট কান ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। বন্দুকবাজ নিজেও গুলিতে নিহত হবার ওর ফলে উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে, তবে সে যে  রিপাবলিকান সমর্থক ছিল প্রমাণিত হওয়ায় দক্ষিণপন্থী সংবাদমাধ্যমের এটাকে ডেমোক্র্যাটোদের চক্রান্ত প্রতিপন্ন করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু ট্রাম্প এতে রাজনৈতিকভাবে বিশাল লাভবান হন। ঘটনার পরে পরেই ঈষৎ রক্তাক্ত অবস্থায় মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ‘ফাইট’ বলার ছবি ‘আইকনিক’ হয়ে যায়। রিপাবলিকান দল ট্রাম্পের সমর্থনে এককাট্টা হয়। ডেমোক্র্যাটরাও সৌজন্যের খাতিরে রাজনৈতিক আক্রমণে কিছুদিন বিরতি দেন। তার কদিন পরেই উইসকনসিন রাজ্যের মিলওয়াকি শহরে রিপাবলিকান দলের সম্মেলন হয়। সেখানে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে প্রচুর উৎসাহ দেখা যায়। ট্রাম্প ওহায়ো রাজ্যের কট্টরপন্থী  তরুণ সেনেটর জে ডি ভ্যান্সকে উপরাষ্ট্রপতি পদের জন্য তাঁর ‘রানিং মেট’ নির্বাচন করেন।   

রিপাবলিকান সম্মেলন শেষ হতে হতেই সেনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা চাক শুমার, হাউসে দলের প্রাক্তন নেত্রী ন্যান্সি পেলোসি, এমনকি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাও বাইডেনের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে লড়াই থেকে সরে দাঁড়াতে অনুরোধ জানান। ডেমোক্র্যাট দলের বড় পৃষ্ঠপোষকদেরও আর্থিক সাহায্য দেওয়ায় ভাঁটা চলছিল। শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের একুশ তারিখ বাইডেন এক বিবৃতিতে জানান তিনি রাষ্ট্রপতিপদে দলের প্রার্থীপদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন এবং উপরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিসের নাম সুপারিশ করছেন সেই পদে।

যে পদকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মনে করা হয়, সেই পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়া কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়। আর এই সরে যাবার ফলে অসুবিধারও সৃষ্টি হতে পারে। ক্ষমতাসীন থাকার সুবিধা আর পাওয়া যায় না। আধুনিক যুগে দুবার এরকম ঘটেছে – ১৯৫২ সালে হ্যারি ট্রুম্যান আর ১৯৬৮ সালে লিন্ডন জনসন (দুজনেই ডেমোক্র্যাট) ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি হয়েও পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই দলের প্রার্থী পরাস্ত হন। আর এক্ষত্রে তো আরও প্রতিকূল পরিস্থিতি, কারণ প্রাইমারির সময় পেরিয়ে গেছে। দলের প্রার্থীর পক্ষে দলের সাধারণ সমর্থকদের সমর্থন যাচাই করা আর সম্ভব নয়। কিন্তু তারপর ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কমলা হ্যারিসকে ঘিরে যে ঐক্য দেখাল, তা অভাবনীয়। দলের উল্লেখযোগ্য প্রায় সকলেই সঙ্গে সঙ্গে হ্যারিসের সমর্থনে নেমে পড়লেন, কেউই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান করলেন না। হ্যারিস সহজেই প্রার্থী হবার প্রয়োজনীয় ভোট জোগাড় করে ফেললেন। এটা খুবই জরুরি ছিল, কারণ এইরকম ঐক্য না হলে যে ফাটল থাকত, নির্বাচনের আগে তা মেরামত করার কোনো অবকাশ পাওয়া যেত না। সেই সঙ্গে যেটা হল, তা ঝিমিয়ে পড়া ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের বিপুল উৎসাহ ফিরে আসা। হ্যারিস একদিনেই নির্বাচনী তহবিলে রেকর্ড পরিমাণ দান পেলেন, যার ৯৫% সাধারণ সমর্থকদের কাছ থেকে এসেছে। ভোটার সমীক্ষার ফলেও ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যেতে লাগল। যেইসব রাজ্যে বাইডেন ট্রাম্পের থেকে পাঁচ-ছয় পয়েন্টে পিছিয়ে পড়েছিলেন, সেইসব ব্যবধান কমতে থাকল। অচিরেই হ্যারিস অনেক রাজ্যে ট্রাম্পকে ধরে ফেললেন বা ছাড়িয়ে যেতে লাগলেন।

ডেমোক্র্যাট দলের পক্ষে এটা খানিকটা অপ্রত্যাশিত সুসংবাদ। প্রার্থীবদল একটা বিরাট ঝুঁকির চাল ছিল, আর দলের সবাইয়ের এইরকমভাবে সহযোগিতা পাওয়া অভূতপূর্ব। এই নিয়ে রিপাবলিকানদের হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে, যখন তাঁরা বলছেন অগণতান্ত্রিকভাবে হ্যারিসকে টিকিট দেওয়া হচ্ছে। হ্যারিস ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এত ভাল ফল করতে পারেন সেটা আগে বোঝা যায় নি। তার কিছুটা কারণ হ্যারিস সারাদেশে তেমনভাবে জনপ্রিয় ছিলেন না। ২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হতে গিয়ে একেবারেই সমর্থন পান নি, প্রাইমারির আগেই সরে যান। অবশ্য তারপর উপরাষ্ট্রপতি হয়ে তাঁর পরিচিতি বেড়েছে, অভিজ্ঞতাও বেড়েছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কাল্পনিক সরাসরি লড়াইয়ের যেসব ভোটার সমীক্ষা হয়েছিল, তাতে হ্যারিস বাইডেনের থেকে ভালো ফল করেন নি। তবে তার একটা কারণ হলো, একজন যতক্ষণ না আসলে প্রার্থী হচ্ছেন, ভোটাররা তাঁকে সেইভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাবেন না। যখন তিনি প্রকৃতপক্ষে দলের প্রার্থী হলেন, ভোটাররা তাঁকে নিয়ে ভাবার অবকাশ পেল এবং তাঁর সমর্থন বাড়ল। কিন্তু বাইডেনের তুলনায় যেরকম নাটকীয়ভাবে হ্যারিসের সমর্থন বাড়ল, তাতে দুটো তত্ত্বের প্রমাণ হল। এক, এই সমর্থন আসলে ব্যক্তি কমলা হ্যারিসের জন্য শুধু নয়, বাইডেনের বিকল্প পরবর্তী প্রজন্মের মুখ হিসেবে, কারণ ভোটাররা কমবয়সী রাষ্ট্রপতি চাইছিল। দ্বিতীয়তঃ বাইডেন সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ‘বাইডেনোমিক্স’ ভোটারদের অপছন্দ বলে রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ও রিপাবলিকান দলের লাগাতার প্রচার আসলে ঠুনকো। তা না হলে উপরাষ্ট্রপতি  হিসেবে একই প্রশাসনের প্রতিনিধি হ্যারিসও জনপ্রিয় হতে পারতেন না।

এইরকম একটা উত্তেজনার আবহে রিপাবলিকান সম্মেলনের একমাস বাদে ডেমোক্র্যাটিক দলের সম্মেলন হলো শিকাগো শহরে। মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজকে হ্যারিস বাছলেন তাঁর রানিং মেট হিসেবে। এ ছাড়া সম্ভাবনা ছিল নর্থ ক্যারোলাইনার গভর্নর রয় কুপার (তিনি নিজেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন), পেনসিলভ্যানিয়ার তরুণ গভর্নর জশ শ্যাপিরো, অ্যারিজোনার সেনেটর মার্ক কেলি আর কেন্টাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ার। সম্মেলন দারুণ সফল হয়। রিপাবলিকান দলের সম্মেলনের থেকেও অনেক বেশি লোক টেলিভিশনে দেখে। সম্মেলনে কয়েকজন বিশিষ্ট রিপাবলিকানও বক্তৃতা দিয়ে হ্যারিসের প্রতি সমর্থন জানান। এই প্রথম কোনো অশ্বেতাঙ্গ মহিলা আর কোনো এশীয় বংশোদ্ভুত মানুষ কোনো প্রধান দলের রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী নির্বাচিত হলেন। 

কমলা হ্যারিসের চেয়ে কেউ ট্রাম্পের বেশি বিপরীত হতে পারতেন না। মহিলা, ষাটের কম বয়সী, ভারতীয় বিজ্ঞানী মা ও জামাইকান অর্থনীতিবিদ বাবার সন্তান, উদারপন্থী মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা কমলা হ্যারিস যেন ট্রাম্প ঠিক যা যা নন, তাই। অ্যাটর্নি হ্যারিস আবার নিজেকে ‘প্রসিকিউটার’ বলে চিহ্ণিত করে বলেছেন তিনি ক্রিমিনালদের ধরণ বোঝেন। বলা বাহুল্য, সেটা আদালতে ট্রাম্প ‘ফেলোন’ প্রমাণিত হওয়ায় কটাক্ষ।  

বিভিন্ন সংস্থার ভোটার সমীক্ষায় ফলের হেরফের আছে, তাই ট্রাম্প-হ্যারিস প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো একটা সর্বসম্মত সংখ্যাত্মক চিত্র দেওয়া মুস্কিল। এই সময় নানা হাবিজাবি ভোটার সমীক্ষাও বাজারে আসছে, বিশেষ করে দক্ষিণপন্থী সংস্থাদের থেকে, যাতে হিসেব গুলিয়ে যায়। বলা বাহুল্য অনিশ্চয়তা যতটা জিইয়ে রাখা যায়, সংবাদমাধ্যমের ততই লাভ। তা ছাড়া জনমত পাল্টাতেই থাকে।  তবে গত কয়েকদিনে ট্রাম্প হয়তো তাঁর অবস্থাটাকে একটু উন্নত করতে পেরেছেন। মোটামুটিভাবে নির্ভরযোগ্য সমীক্ষাগুলোর গড়ের ভিত্তিতে বলা যায় হ্যারিস এই মুহুর্তে হয়তো ট্রাম্পের থেকে সারা দেশে তিন শতাংশের মতো বেশি লোকের সমর্থন পাচ্ছেন, ৪৯-৪৬ ব্যবধানে। কিন্তু সেটা জেতার জন্য যথেষ্ট কি?

এই প্রশ্নটা তোলার কারণ হল, আমেরিকার নির্বাচনের জটিল পদ্ধতি। দেশের মানুষ সরাসরি রাষ্ট্রপতিপদের জন্য ভোট দিলেও জয় নির্ধারণ মোট পাওয়া ভোটের হিসেবে হয় না। প্রত্যেকটি রাজ্যের একটা নির্দিষ্টসংখ্যক ‘ইলেক্টোরাল ভোট’ থাকে, যা মোটামুটি সেই রাজ্যের জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হয়। তবে অনেক কম জনবহুল রাজ্যের প্রতিনিধি বেশি জনবহুল রাজ্যের তুলনায় মাথাপিছু হিসেবে অনেকটা বেশি থাকে, কারণ এই সংখ্যাটা তিনের কম হয় না কখনও। কোনো রাজ্যে যে প্রার্থী সবথেকে বেশি ভোট পান, তিনি সেই রাজ্যের সমস্ত ইলেক্টোরাল ভোট জিতে নেন, তা সে যত কম ব্যবধানেই হোক না তাঁর জয় (এর দুটো সামান্য ব্যতিক্রম আছে, যা আলোচনা না করলেও চলবে)। সব মিলে সারা দেশে ‘ইলেক্টোরাল কলেজে’ ৫৩৮ টা ইলেক্টোরাল ভোট আছে, ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে হলে ২৭০ টা ইলেক্টোরাল ভোট পেতে হবে। আবার কোন রাজ্যে কোন দলের জেতার সম্ভাবনা কিরকম সেটা রাজ্য থেকে রাজ্যে আকাশপাতাল তফাৎ হতে পারে। মোটামুটিভাবে পশ্চিম উপকূলে আর উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রাধান্য। রিপাবলিকানদের জোর আছে দেশের মাঝে এবং দক্ষিণ-পূর্বে। অনেক রাজ্য এরকম আছে যেখানে ফলাফল হয় একপেশে, চমকের জায়গা নেই। নিশ্চিত (সমর্থনের ব্যবধান ১৫ শতাংশের বেশি) আর সম্ভাব্য (সমর্থনের ব্যবধান ৫-১৫ শতাংশ) রাজ্যগুলিকে ধরলে ডেমোক্র্যাটদের ২২৬ টা ইলেক্টোরাল ভোট বাঁধা। এই সংখ্যাটা রিপাবলিকানদের ২১৯। তাই জয়ী নির্ধারণ করবে সাতটি ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ রাজ্য উইসকন্সিন (১০), মিশিগান (১৫), পেনসিলভ্যানিয়া (১৯), নেভাদা (৬), অ্যারিজোনা (১১), জর্জিয়া (১৬) আর নর্থ ক্যারোলাইনা (১৬) --- বন্ধনীর ভিতরের সংখ্যা সেই রাজ্যের ইলেক্টরাল ভোটের সংখ্যা। তাই এইসব রাজ্যে যে প্রার্থী ভাল অবস্থায় আছেন, তাঁর জয়ের সম্ভাবনা বেশি। সেই হিসেবেই ২০১৬ সালে সারা দেশে মোট ভোট প্রায় তিরিশ লক্ষ কম পেয়েও নেভাদা বাদে এই সবকটা রাজ্য অল্প ব্যবধানে জিতে ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবার ২০২০ তে জয়ী প্রার্থী বাইডেন একমাত্র নর্থ ক্যারোলাইনা বাদে এই সবকটি রাজ্য জেতেন। সেখান থেকে হিসেব করলে ট্রাম্প পিছিয়ে শুরু করছেন। জিততে হলে তাঁকে এই রাজ্যগুলির অনেককটাই জিততে হবে, আর আগেরবারের জেতা কিছু হারানো চলবে না।  উইসকন্সিন আর মিশিগানে ট্রাম্প এই মুহুর্তে বেশ খানিকটা পিছিয়ে। হ্যারিস তার উপরে পেনসিলভ্যানিয়া জিতে নিলেই নির্বাচিত হয়ে যাবেন, বাকি রাজ্যগুলো হেরে গেলেও। তাঁর জেতার অন্য রাস্তাও আছে, যেমন আরিজোনা আর জর্জিয়া জিতলেও চলবে, বা নেভাদা আর জর্জিয়া, বা এরকম আরো অনেক। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সব থেকে সম্ভাব্য জয়ের রাস্তা নর্থ ক্যারোলাইনা, পেনসিল্ভ্যানিয়া আর জর্জিয়া জেতা --- অন্য রাস্তাগুলো প্রায় বন্ধ। এর মধ্যে নর্থ ক্যারোলাইনাতে ট্রাম্প হয়তো চুলচেরা ব্যবধানে এগিয়ে, পেনসিল্ভ্যানিয়া আর জর্জিয়ায় হয়তো হ্যারিস চুলচেরা ব্যবধানে এগিয়ে। তবে সমীক্ষার ফল অনেকক্ষেত্রেই সন্দেহজনক। যেমন উইসকনসিন-মিশিগান-পেনসিল্ভ্যানিয়ার মধ্যে উইসকনসিন সবথেকে গ্রামীণ আর শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত, ফলে ডেমোক্র্যাট পার্থীর পক্ষে সবচেয়ে কঠিন। তাই উইসকনসিনে ভাল এগিয়ে থাকলে বাকি দুটো রাজ্যতেও হ্যারিসের ভালভাবে এগিয়ে থাকা উচিৎ। সেইজন্য সমীক্ষার ফল শুধু নয়, পারিপার্শিককেও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

সোজা হিসেবে ভালভাবেই হ্যারিসের জেতার কথা। তাঁর যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতা নিয়ে সংশয় নেই --- উপরাষ্ট্রপতি হবার আগেও তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি, অ্যাটর্নি জেনেরাল আর সেনেটর হিসেবে মোটের উপর প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। তিনি যে মোট ভোট বেশি পাবেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইলেক্টোরাল কলেজের কারণে (আর আদালতে আর বিভিন্ন রাজ্যে ট্রাম্প-অনুগত অফিসিয়ালদের শংসাপত্র দেবার সময় ট্রাম্পের অনুকূলে নির্বাচনের ফলাফল উলটে দেবার চেষ্টা হবে বলে) ট্রাম্প কাঁটা রয়েই যাচ্ছে। ট্রাম্পের তুলনায় সহস্রভাগের একভাগ অভিযুক্ত হলেই আর যে কারুর  রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে যেত, তবু ট্রাম্প বহাল তবিয়তে রিপাবলিকান পার্টিতে সবথেকে ক্ষমতাবান হয়ে টিকে থাকেন, ভোটে পরাজিত হয়েও। ট্রাম্প কেমন লোক, তা জেনেও ২০১৬ তে বহু লোক তাঁকে ভোট দিয়ে জেতান। চারবছর তার সময়ে নানা বিতর্কিত ঘটনা, কোভিডের সময় চুড়ান্ত অব্যবস্থা সত্ত্বেও ২০২০ তেও তিনি প্রচুর ভোট পান। ব্যক্তি ট্রাম্পকে নয়, তাঁর নীতি পছন্দ করি বলে কোন নীতি কেন পছন্দ কিছুই বলতে না পারা লোক প্রচুর আছেন। ট্রাম্পের সময়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভাল ছিল, বাইডেনের সময় তা ধ্বংস হয়ে গেছে, এরকম মনে করেন বহু লোক, যদিও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গড় হার দুই সময়েই প্রায় সমান, বরঞ্চ বাইডেনের সময় প্রচুর লোকে কাজ পেয়েছে যেখানে ট্রাম্পের সময়ে লোক কাজ হারিয়েছে বেশি (শেষ বছরে কোভিডের কারণে)। তবে বাইডেনের সময় জিনিসের দাম অনেক বেড়েছে, যার মূল কারণও কোভিড। পরিকাঠামো উন্নত করায় বাইডেনের সরকার বহু প্রশংসনীয় কাজ করেছে, যাতে গ্রামীণ রিপাবলিকান অঞ্চলে মানুষ বেশি উপকৃত, কিন্তু তার কৃতিত্ব পায় নি। এমনকি হাস্যকরভাবে ট্রাম্পের সময়ে হওয়া ঘটনা নিয়ে বাইডেনের সরকারের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অনেকে। কাজেই ট্রাম্প যাই করুন, যত অর্থহীন কথাই বলুন, একশ্রেণির মানুষ তাঁকে অন্ধ সমর্থন করেই যাবেন। তাদের সংখ্যাটা অন্ততঃ পঁচিশ শতাংশ হবেই। আরো গোটা পনের শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে অপছন্দ করলেও রক্ষণশীলদের মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে ট্রাম্পকে ভোট দেবেন। এ ছাড়া আরো গোটা পাঁচ শতাংশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভোটার ডেমোক্র্যাটদের তীব্র অপছন্দ করার জন্য ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে থাকেন। ফলে ট্রাম্প ৪৪-৪৬% ভোট মোটামটি ধরেই রাখছেন, তবে তার থেকে বেশিও আর এগোতে পারছেন না। ছোট গ্রামীণ রাজ্যগুলোর ভোটের দাম মাথাপিছু বেশি আর সেখানে রিপাবলিকানদের প্রাধান্য থাকায় মোট ভোটের তুলনায় ইলেক্টোরাল কলেজে রিপাবলিকানদের কিছুটা  বাড়তি সুবিধা আছে। মোটামুটিভাবে তিন শতাংশের ব্যবধানকে টিপিং পয়েন্ট মনে করা হয় যাতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেতেন। গত নির্বাচনে বাইডেন সাড়ে চার শতাংশ ব্যবধানে জিতেছিলেন। সেই নিরিখে হ্যারিস হয়তো একটু পিছিয়ে, তবে টিপিং পয়েন্ট পেরিয়ে যাবেন মনে করা যায়। ডেমোক্র্যাটদের আর একটা চিন্তার বিষয় হল রিপাবলিকানদের করা ‘ভোটার সাপ্রেশন’। কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, ছাত্রছাত্রী এবং কম আয়ের মানুষেরা, যারা ডেমোক্র্যাটদের বেশি হারে ভোট দিয়ে থাকেন, প্রশাসন ব্যবহার করে ও নানা উদ্ভট আইন বানিয়ে তাদের ভোট দিতে নানা অসুবিধার সৃষ্টি করা। রিপাবলিকানদের নিশ্চিত রাজ্যগুলোয় তার ফলে তেমন কিছু তফাৎ না হলেও ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যগুলোয় তার সুদূরপ্রসারী ফল হতে পারে। জর্জিয়া আর টেক্সাসে এইধরণের কিছু ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট সহ দেশের বিভিন্ন আদালতে রক্ষণশীল বিচারপতিদের সংখ্যাধিক্যও একটা চিন্তার ব্যাপার, কারণ তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে পারেন। ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রপতিকে শক্তিশালী রক্ষাকবচ দিয়েছে, যাতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর বিচার চাইতে অসুবিধা হচ্ছে। আর হ্যারিসকে মোকাবিলা করতে হবে সীমান্ত সমস্যার প্রচারকে, ট্রান্স-জেন্ডার সংক্রান্ত বিতর্কের আর ইউক্রেন-গাজা সহ আন্তর্জাতিক প্রশ্নের। শেষোক্ত ব্যাপারে খুবই সূক্ষ্ম অবস্থান নিয়ে ইজরায়েলের সমর্থক (আমেরিকার রাজনীতিতে অসীম প্রভাবশালী) আর প্যালেস্টাইনের সমর্থক (মিশিগানে জয়-পরাজয় নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় উপস্থিত) দুই পক্ষকেই খুশি করার চেষ্টা করতে হবে।

তবে ট্রাম্পেরও আছে অজস্র সমস্যা। বাইডেনের বৃদ্ধত্বকে আক্রমণ করে গত দুবছরের প্রচার শুধু জলে গেছে তাইই নয়, সেই তীরগুলো ট্রাম্পের দিকেই ফিরে আসছে। বাইডেন সরে দাঁড়ানোয় ট্রাম্প এখন ইতিহাসের বৃদ্ধতম রাষ্ট্রপতিপদের প্রার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে প্রায় কুড়ি বছরের বড়। মানুষ সেই তফাৎটা দেখতে পাচ্ছে। হ্যারিসকে কীভাবে আক্রমণ করা যাবে ভেবে না পেয়ে তাঁর বর্ণ, চেহারা বা মেধা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোটারদের কাছে আরো অপ্রিয় হয়েছেন। হ্যারিসের সমর্থকরা বিপুল উৎসাহে তাঁর নির্বাচনী তহবিলে দান করছেন, ভোটের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নাম লেখাচ্ছেন। অগস্ট মাসে হ্যারিস ট্রাম্পের প্রায় তিনগুণ টাকা যোগাড় করেছেন, যার প্রায় পুরোটাই ‘স্মল ডোনারদের’ দেওয়া, অনেকেই তাদের মধ্যে প্রথমবারের ভোটার বা দাতা। তুলনায় ট্রাম্পের নির্বাচনী তহবিলের বিরাট অংশ যাচ্ছে তাঁর আইনি লড়াইয়ে। মিনেসোটা, ভার্জিনিয়া বা নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে থাকা কিন্তু নিশ্চিত নয় এরকম রাজ্যগুলো যা ট্রাম্প জেতার আশা করছিলেন বাইডেনের বিরুদ্ধে, সেগুলোর আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনী কর্মী তুলে নিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি, ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যগুলোর মধ্যেও সব টাকা শুধু পেনসিলভ্যানিয়া আর জর্জিয়াতেই ঢালছেন, যেখানে হ্যারিস তাঁর বিপুল তহবিল নিয়ে সমস্ত ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে ব্যাপক প্রচার ও জনসভা করছেন। কিন্তু এর ফলে ট্রাম্প যদি নর্থ ক্যারোলাইনা হারান (সেটা হতেই পারে --- উত্তরের রাজ্যগুলো থেকে প্রচুর মানুষ কাজের সূত্রে নর্থ ক্যারোলাইনায় চলে এসেছেন যাদের মধ্যে উদারপন্থী ও অশ্বেতাঙ্গ মানুষ প্রচুর), ট্রাম্পের আশার সেখানেই সমাপ্তি।

হেরিটেজ ফাউন্ডেশন নামে এক উগ্র দক্ষিণপন্থী প্রতিষ্ঠানের তরফে ‘প্রজেক্ট ২০২৫’ নামে একটা ফ্যাসিস্ট পরিকল্পনা করা হয়েছিল ক্ষমতা পেয়ে কীভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কব্জা করে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে নানা দক্ষিণপন্থী ব্যবস্থা চালু করা হবে। ৯০০ পাতার সেই পরিকল্পনার বিবরণ লুকিয়ে রাখার চেষ্টাও করা হয় নি। এখন ট্রাম্প এই পরিকল্পনা জানার কথা অস্বীকার করলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগের যথেষ্ট প্রমাণ আছে। ট্রাম্পের রানিং মেট ভান্স হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বইতে মুখবন্ধও লিখেছেন। ট্রাম্প গোঁড়া খৃষ্টান মৌলবাদী ইভানজেলিকালদের একটা ঘরোয়া সভায় বলেছেন  এবার তাঁকে ভোট দিলে এমন ব্যবস্থা করে ফেলবেন যে পরের বার থেকে আর ভোট দেবার কষ্টটুকুও করতে হবে না। আমেরিকার ডিক্টেটর হবারও আশা প্রকাশ করেছেন, আবার বলেছেন সেটা শুধু প্রথম দিনের জন্য। জিতলে যে তাঁর রাজনৈতিক শত্রুদের উপর প্রশাসন ব্যবহার করে আক্রমণ চালাবেন, তাও জানিয়েছেন। বস্তুতঃ, এই নির্বাচন ট্রাম্পের কাছে শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আর বিরোধী রাজনীতিকদের উপর প্রতিশোধ নেবার রাস্তা। কাজেই গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন জরুরি হয়ে পড়েছে ও অনেক ভোটারকে বিব্রত করেছে। 

এ ছাড়া আছে গর্ভপাতের অধিকারের প্রশ্ন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারপতিদের রায়ে পঞ্চাশ বছর ধরে চালু থাকা গর্ভপাতের অধিকার ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। মহিলা আর অল্পবয়সীদের মধ্যে তা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। রিপাবলিকানদের রাজ্যেও গণভোট যেখানে হচ্ছে, মানুষ অধিকার রাখার সপক্ষে রায় দিচ্ছে। ভোটার সমীক্ষার তুলনায় রিপাবলিকানদের ফল অনেক খারাপ হচ্ছে। ২০২২ এ হাউস অফ কংগ্রেসের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কোনোমতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান, যেখানে তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার কথা ছিল। এমন কিছু অঞ্চলে রিপাবলিকানরা হেরেছে যেগুলো খুব রক্ষণশীল এলাকা। শহরতলির মহিলারা ব্যাপকহারে ভোট দিয়ে বাইডেনকে জিতিয়েছিলেন। হ্যারিসকে গত দু’বছর ধরে মহিলা ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে গেছেন, বিশেষ করে গর্ভপাতের অধিকারের দাবী জানিয়ে। সেই উদ্যোগের ফল হ্যারিস অনেকটাই পাবেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের দুবার দুরকম জবাব মহিলাদেরও চটিয়েছে, আর কট্টরদেরও খুশি করতে পারেনি।

এর পর আছে রানিং মেটের ভূমিকা। রাষ্ট্রপতি পদে যিনি লড়েন, তিনি এমন কাউকে বাছেন যিনি নীতির প্রশ্নে মোটামুটি সহমত কিন্তু অন্য কোনো ক্ষেত্রে পরিপূরকের ভুমিকা পালন করে নতুন কিছু ভোটার জোগাড় করবেন। হ্যারিসের রানিং মেট টিম ওয়ালজ শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, মিনেসোটার মতো দেশের মাঝে অবস্থিত এক রাজ্যের গভর্নর যেখানে হ্যারিস নিজে মহিলা, অশ্বেতাঙ্গ ও উপকূলরাজ্যের বাসিন্দা। ওয়ালজ একজন জনপ্রিয় গভর্নর, স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। মিনেসোটা ঠিক ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য না হলেও মিডওয়েস্টের প্রতিবেশি রাজ্য উইসকন্সিন আর মিশিগান জিততে তাঁর প্রভাব কাজে লাগতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প ভান্সকে নিয়ে কোনো লাভ করতে পারছেন না। যখন ভান্সকে বাছা হয়, তখন বাইডেনের বিরুদ্ধে সহজেই জয় আসছে মনে করে ট্রাম্পের মতই আর একজন তবে কমবয়সীকে নিয়ে তাঁকে ২০২৮ সালের জন্য তৈরি করার পরিকল্পনা হচ্ছিল। বিলিনেয়ার পিটার থিলের ঘনিষ্ঠ ভান্সকে নেওয়া ওয়াল স্ট্রিটের বড় পুঁজিকে খুশি করতেও বটে। উচ্চশিক্ষিত হলেও সামাজিক বিষয়ে ভান্সের মত, বিশেষতঃ মহিলাদের ভূমিকা সম্পর্কে ও গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে, অত্যন্ত রক্ষণশীল। তিনি যতবার মুখ খোলেন, মহিলাদের পক্ষে অবমাননাকর কিছু বলেন। ওহায়ো ট্রাম্প এমনিতেই জিততেন, তাই ভান্সকে রেখে বাড়তি কোনো লাভ নেই, আর ভান্স ওহায়োতেও তেমন জনপ্রিয় নন। আবার একসময় ট্রাম্পের কড়া সমালোচক ছিলেন আর স্ত্রী ভারতীয় বলে ট্রাম্প অনুগামী ‘MAGA’ কাল্টের কাছেও ভান্স অবাঞ্ছিত। এ হেন ভোটার তাড়ানো রানিং মেট ট্রাম্পের কপালের ভাঁজ বাড়িয়েছেন। বাইডেন সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা রিপাবলিকান সম্মেলনের পরে করে এ ব্যাপারে একটা মোক্ষম চাল দিয়েছেন। এখন ভান্সকে ঝেড়ে ফেলা আর ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব নয়।

আর আছে বহু উল্লেখযোগ্য রিপাবলিকান নেতাদের ট্রাম্পের বিরোধিতা। ট্রাম্পের উপরাষ্ট্রপতি মাইক পেন্স সহ ট্রাম্প প্রশাসনে কাজ করা চুয়াল্লিশ জনের মধ্যে চল্লিশ জনই হয় সরাসরি কমলা হ্যারিসকে সমর্থন জানিয়েছেন নয়তো ট্রাম্পকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেছেন। প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি ডিক চেনি ও তাঁর কন্যা প্রাক্তন আইনসভার সদস্যা লিজ চেনি, যাঁরা সারাজীবন রক্ষণশীল রিপাবলিকান রাজনীতি করেছেন, সরাসরি হ্যারিসকে সমর্থন জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিপদে ওবামার বিরুদ্ধে লড়া মিট রমনিও ট্রাম্পকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেছেন। ট্রাম্পও জর্জিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের জনপ্রিয় গভর্নর ব্রায়ান কেম্পের সঙ্গে অকারণে বিরোধে জড়িয়ে জর্জিয়ার লড়াইকে কঠিন করে ফেলেছেন। ট্রাম্পের ভয়ে (রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যেতে পারে বলে) প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও  অনেক রিপাবলিকান নেতাই চান যে ট্রাম্প হেরে শেষ হয়ে যান যাতে তাঁরা MAGA কাল্টকে ঝেড়ে ফেলে পুরোনো রক্ষণশীল রিপাবলিকান দলকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন।

সেনাবাহিনীর ব্যাপারে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া ট্রাম্পের আরেক সমস্যা। আগেও বহুবার নানা অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, কিন্তু এবারে আর্লিংটন সেমেটারিতে গিয়ে নির্লজ্জ নির্বাচনী ‘ফটো অপ’ করে শুধু বিতর্ক সৃষ্টি নয়, আইনও ভেঙ্গেছেন। যুদ্ধে নিহত সেনাবাহিনীর সদস্যদের পরিবার সেটা খুব খারাপভাবে দেখছে।  

অন্যান্য প্রার্থীদের উপস্থিতি আর একটা ভাবার বিষয়। এদের কারুর কোনো রাজ্য জেতার সম্ভাবনা নেই, তবে ‘স্পয়লার এফেক্ট’ করার ক্ষমতা থাকতে পারে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য আর এফ কে জুনিয়রের কথা। এই ব্যক্তিটি বিশিষ্ট ডেমোক্র্যাট কেনেডি পরিবারের একজন। তিনি পরিবেশ আইনজ্ঞ ও আন্দোলনকারী, আবার কোভিডের টিকার বিরোধী, শুরুতে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাইমারিতে ছিলেন। বলছিলেন বাইডেন না, তিনিই পারেন ডেমোক্র্যাটদের হয়ে ট্রাম্পকে হারাতে। পাত্তা না পেয়ে অচিরেই ইন্ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে দাঁড়ান, যদিও কেনেডি পরিবারের বাকি সকলেই বাইডেনের প্রতি সমর্থন জানান। তাঁর প্রচারের টাকা আসতে থাকে ট্রাম্পকে সমর্থন করা কর্পোরেট দাতাদের কাছ থেকে। কাজেই পরিষ্কার কারা তাঁকে মদত দিচ্ছে। তাঁদের হিসেব ছিল আর এফ কে জুনিয়র বাইডেনের ভোট কেটে ট্রাম্পকে জেতাবেন। কিন্তু সমীক্ষায় বোঝা গেল তিনি ট্রাম্পের ভোটই বেশি কাটছেন। তার মূল কারণ কোভিড টিকা বিরোধীরা মূলতঃ ট্রাম্পের ভোটার। শুরুতে আর এফ কে জুনিয়র অনেক লোকের সমর্থন পাচ্ছিলেন, কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসছিল, তাঁর সমর্থন তলানিতে ঠেকছিল। তার কথাবার্তাও ক্রমশঃ প্রলাপের মতো হয়ে যাচ্ছিল। তিনি প্রথমে ট্রাম্প শিবিরকে প্রস্তাব দিলেন ট্রাম্পের সমর্থনে দান ছেড়ে দেবার বদলে ট্রাম্পের ক্যাবিনেটে জায়গা। তারা রাজি না হতে হ্যারিস শিবিরকে একই প্রস্তাব দেন। সেখানে সটান না বলে দেওয়া হয়। হালে আবার ট্রাম্প শিবিরের সঙ্গে বোঝাপড়া হওয়াতে ট্রাম্পের সমর্থনে সরে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাম্পের ‘ট্রান্সিশন টিম’ এও জায়গা পেয়েছেন। তবে অনেক রাজ্য তাঁকে ব্যালট থেকে সরিয়ে দিতে নারাজ। আর এফ কে জুনিয়রের যে অল্পসংখ্যক সমর্থক রয়েছেন, তারা কী করবেন নিশ্চিত নয়। আর তিনি সরে দাঁড়ানোয় ট্রাম্পের লাভের পরিমাণ নগন্য হতে পারে।

অনেকে ভাবেন এই দেশটা এত রক্ষণশীল যে মহিলা রাষ্ট্রপতির জন্য প্রস্তুত নয়। প্রমাণ হিসেবে তাঁরা ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিন্টনের পরাজয়ের কথা বলেন। বারাক ওবামা ২০০৮ সালে যখন প্রার্থী হয়েছিলেন, তখনও বলা হয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ কেউ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারবে না, কিন্তু ওবামা প্রচুর ভোটে জিতেছিলেন। অন্যদিকে ‘ইনসাইডার’ হিলারির প্রতি প্রচুর মানুষের বিতৃষ্ণা ছিল, তাঁর নির্বাচনী কৌশলে বিরাট ভুল ছিল আর তাঁর ভাগ্যও ছিল বিরূপ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প তখন রাজনীতিতে  একটা চমক নিয়ে এসেছিলেন। ট্রাম্পের সেইসব একই কথা এই আট বছরে লোকের লক্ষবার শোনা হয়ে গেছে, সেই চর্বিত-চর্বনে আর নতুনত্ব কিছু নেই, ট্রাম্পের জনসভাতেও লোকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। হ্যারিসের শিবির ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যগুলোকে হিলারির মতো হাল্কাভাবে নিচ্ছে না, প্রচুর প্রচার আর জনসভা করছে। এই আট বছরে জনবিন্যাসে বদলও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাবে। মহিলা, কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ভোটার রেজিস্ট্রেশন বিশেষ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা হ্যারিসের সাহায্যে আসবে। অন্যদিকে টিকা না নেওয়া বৃদ্ধবৃদ্ধারা অনেকে কোভিডে মারা গেছেন, যারা মূলতঃ ট্রাম্পের ভোটার। সুতরাং প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে হ্যারিস ইতিহাস সৃষ্টি করার জায়গায় রয়েছেন। হ্যারিস যদি আসন্ন আনুষ্ঠানিক বিতর্কে ভাল পারফর্মেন্স করেন, তবে তিনি জয়ের দোরগোড়ায় পৌছে যাবেন।

 

--------------------

লেখার তারিখ ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৪

'সৃষ্টির একুশ শতক' পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত