শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২০

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ

 প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ

২৯শে জুন, ১৮৯৩-- ২৮শে জুন, ১৯৭২

 

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ ভারতবর্ষে পরিসংখ্যানবিদ্যার জনক, এক জীবনের পক্ষে এটা যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য অবদান, তবে শুধু এইটুকু বললে তাঁর সম্বন্ধে কিছুই বলা হয় না। তিনি ছিলেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, দক্ষ নেতা সংগঠক, দেশ গড়ার কারিগর, সমাজসচেতন বিজ্ঞানী অসামান্য গবেষক। মহলানবীশের অপূর্ব সাংঠনিক ক্ষমতার তুলনা খুব কমই পাওয়া যায়। পরিসংখ্যানবিদ্যায় ভারতীয় গবেষকরা পৃথিবীতে প্রথম সারিতে পড়েন, এটা মহলানবীশ এবং তাঁর গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলি না থাকলে কিছুতেই সম্ভব হত না। মহলানবীশ যখন পরিসংখ্যানবিদ্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং তার প্রয়োগ করছেন, তখন ভারতবর্ষ তো বটেই, সারা পৃথিবীই পরিসংখ্যানবিদ্যা সম্পর্কে খুব কম জানত। কার্ল পিয়ার্সন বা স্যার রনাল্ড ফিশারের মতো আধুনিক পরিসংখ্যানবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতারা তখন সবে গবেষণা শুরু করেছেন। তৎকালীন বাংলা বা ভারতবর্ষে পরিসংখ্যানবিদ্যাকে শুধুমাত্র সরকারি কাজের অংশ মনে করা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানবিদ্যার আলাদা কোনও হিসেবে স্বীকৃতি ছিল না। এমন একটি সময়ে পরাধীন দেশে প্রায় একার চেষ্টায় পরিসংখ্যানবিদ্যা চর্চার উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সফল হওয়া মহলানবীশের এক অনন্য কৃতিত্ব, আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে যার তুলনা মেলা ভার।

 

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ বাংলার নবজাগরণের শেষ প্রজন্মের সর্বশেষ জীবিত আইকন ছিলেন বলা যেতে পারে। কলকাতায় এক সচ্ছল উদারমনোভাবাপন্ন ব্রাহ্ম পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে। প্রশান্তচন্দ্রের পিতামহ গুরুচরণ ভাগ্য অনুসন্ধানে কলকাতা শহরে চলে আসেন ধীরে ধীরে সফল ব্যবসা গড়ে তোলেন। তিনি ব্রাহ্মসমাজের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং কোষাধক্ষ্য পরে সভাপতিও হয়েছিলেন। তাঁর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়ি ব্রাহ্মসমাজের কার্যকলাপের কেন্দ্র ছিল। বহু বাল্যবিধবাকে তিনি নতুন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি নিজেও বিধবাবিবাহ করেছিলেন। প্রশান্তচন্দ্রের জেঠামশাই সুবোধচন্দ্র এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ছিলেন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে মনোবিদ্যার অধ্যাপক পরে বিভাগীয় প্রধান হয়েছিলেন। পিতা প্রবোধচন্দ্র তাঁর পিতার ব্যবসায় প্রথমে যোগদান করে পরে নিজেও সফল ব্যবসা শুরু করেন। প্রশান্তচন্দ্রের মাতা নিরোদবাসিনী দেবী ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক নীলরতন সরকারের ভগিনী। পরিবারের শিক্ষা, উদার চিন্তাধারা ব্যবসায়ী প্রেক্ষাপট প্রশান্তচন্দ্রের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

 

পরিসংখ্যানবিদ্যায় মহলানবীশের উৎসাহ শুরু হয় কিছুটা আকস্মিকভাবে। তাঁর প্রথাগত শিক্ষা ছিল পদার্থবিদ্যায়, প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক হন। সেখানে তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে। প্রেসিডেন্সিতে মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। ১৯১৩ সালে তিনি উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে  লন্ডন যাত্রা করেন। ঘটনাচক্রে কেম্ব্রিজে বেড়াতে গিয়ে কিংস কলেজ দেখে তিনি মুগ্ধ হন, এক ভারতীয় বন্ধুর পরামর্শ মেনে সেখানেই গণিতশাখায় ভর্তি হন। কেম্ব্রিজে তাঁর সঙ্গে গণিতের বিরল প্রতিভা রামানুজনের সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁরা দীর্ঘসময় একসাথে হাঁটতে বেরোতেন নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন। ছাড়াও কেম্ব্রিজ বাসকালে দার্শনিক লোয়েস ডিকিনসন বাট্রান্ড রাসেল এবং গণিতবিদ গডফ্রে হার্ডির সঙ্গে চিন্তাভাবনার আদানপ্রদান মহলানবীশের চিন্তাধারায় উদারতা সার্বজনীনত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। তবে বিমূর্ত গণিতে মহলানবীশের তেমন আগ্রহ গড়ে না ওঠায় তিনি পদার্থবিদ্যায় ফিরে আসেন। ১৯১৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয়ভাগ উত্তীর্ণ হবার পর সি টি আর উইলসনের সাথে কেম্ব্রিজে ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে কাজ করার জন্য বরিষ্ঠ গবেষকের পদে নির্বাচিত হন। ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে গবেষকপদে যোগদানের আগে কিছু সময় হাতে থাকায় মহলানবীশ  ভারতবর্ষে ছুটি কাটাতে আসা মনস্থ করেন। কিন্তু প্রথম মহাযুদ্ধের ফলে তাঁর যাত্রা পিছিয়ে যায়। সেই সময় তিনি কিংস কলেজের গ্রন্থাগারে নানা বইপত্র পড়ছিলেন। কলেজের এক অধ্যাপক ম্যাকুলার সাথে সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় ম্যাকুলা একটি বিজ্ঞানপত্রিকার কতগুলি সংখ্যার প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেগুলি ছিল বিজ্ঞানের এক সদ্যজাত শাখা পরিসংখ্যানবিদ্যার উপর কার্ল পিয়ার্সন প্রতিষ্ঠিত  বায়োমেট্রিকা পত্রিকার। সেখানে প্রকাশিত কিছু গবেষণাপত্র পড়ে মহলানবীশ এতটাই আগ্রহান্বিত হন যে বায়োমেট্রিকার তখন পর্যন্ত প্রকাশিত সবকটি সংখ্যা তিনি কিনে নিয়ে  দেশে ফেরার পথে  জাহাজে পড়ে ফেলেন। তিনি এর ফলে উপলব্ধি করেন পরিমাপ তার বিশ্লেষণ সম্পর্কিত বিজ্ঞানের এই নতুন শাখা পরিসংখ্যানবিদ্যা বহু ফলিত গবেষণার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। কলকাতা ফিরে তিনি আবহবিজ্ঞান নৃতত্ত্ববিদ্যার বেশ কিছু সমস্যার খোঁজ পান যাতে তিনি তাঁর এই নতুন অধিত বিদ্যা প্রয়োগ করতে পারেন। কেম্ব্রিজে পদার্থবিদ্যায় বরিষ্ঠ গবেষকের পদে যোগদানের পরিকল্পনা তিনি ত্যাগ করেন প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকপদে যোগ দেন। তাঁর নামাঙ্কিত ডি-স্কোয়ার পরিসংখ্যাত সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক গবেষণা করেছিলেন তিনি পরিসংখ্যানবিদ্যায়। তবে ফলিত গবেষণায় তাঁর আগ্রহ ছিল আরও অনেক বেশি। নৃতত্ত্ব, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পাটের ফলন ও বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক, শিক্ষাক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তির পরিমাপ ইত্যাদি বহু বিষয়ে তিনি পরিসংখ্যানবিদ্যার সফল প্রয়োগ করেন।

 

পরিসংখ্যানবিদ্যায় অসামান্য অবদান ছাড়াও যে কারণে মহলানবীশ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তা হল তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা নেতৃত্বগুণের জন্য। মহলানবীশ প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট বা আই এস আই, যার প্রতিষ্ঠা প্রেসিডেন্সি কলেজে একটি ছোট গবেষণাগারে, যার শুরু মাত্র ২৩৮ টাকার মূলধন নিয়ে, তা ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা গবেষণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মহলানবীশের মৃত্যুর সময় আই এস আই এর বাৎসরিক আয়ব্যয় দাঁড়িয়েছিল দুকোটি টাকায়, দু হাজার কর্মী কাজ করত, কলকাতার মূল কেন্দ্র ছাড়াও আরও আটটি কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল --- বলা বাহুল্য এখন এই সংখ্যাগুলো আরও অনেকগুণ বেড়েছে। আই এস আই মডেল অনুসরণ করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেট্রুড কক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পরিসংখ্যানবিদ্যার আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা কিনা তার আগে পর্যন্ত গণিত বিভাগের অন্তর্গত হত। মহলানবীশ ছাড়াও আরও অনেক বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ বিজ্ঞানীরা মহলানবীশের জীবিতকালেই আই এস আই কাজ করেছেন। কুড়ি আর তিরিশের দশকে ভারতবর্ষে পরিসংখ্যানবিদ্যার প্রায় সমস্ত কাজ মহলানবীশ তাঁর ছাত্রদের দ্বারা হয়েছিল। এমনকি রাজচন্দ্র বোস সমরেন্দ্রনাথ রায়ের বেশ কিছু বিখ্যাত  তাত্ত্বিক গবেষণা মহলানবীশের গবেষণার ফলশ্রুতি। প্রখ্যাত ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী জে বি এস হল্ডেন ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বায়োমেট্রি বিভাগের প্রধান হিসেবে আই এস আই তে যোগ দেন। পঞ্চাশের দশকে আই এস আই এর দায়িত্ব আরও বাড়ে, ন্যাশানাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গ্যানাইজেশনের যোগাড় করা তথ্য নথিকরণ সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করার জন্য। দেশ স্বাধীন হবার পরে দেশীয় শিল্পের গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংখ্যাতাত্ত্বিক পরামর্শ দেওয়ারও প্রয়োজন দেখা দেয়। কলকাতা দিল্লীতে পরিকল্পনা শাখা, সমাজতত্ত্ব জনতত্ত্ব, বৈদ্যুতিন বিভাগ এই সবেরও আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা হয়। প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু, অর্থমন্ত্রী সি ডি দেশমুখ কেন্দ্রীয় সরকারে প্রভাবশালী পিতাম্বর পন্থের সাথে মহলানবীশের ব্যক্তিগত সখ্যতা ছিল। এরা সকলেই আই এস আই এর গড়ে ওঠায় বিশেষ সহযোগিতা করেন। পঞ্চাশের দশকে যন্ত্রগণক বিভাগ শুরু হয় ভারতবর্ষের প্রথম যন্ত্রগণক আই এস আইতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৫৯ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় আই এস আই অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়, যাতে আই এস আই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। তার ফলে আই এস আই স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং স্নাতক স্নাতকোত্তর উপাধি দেবার অধিকার পায়। প্রথম যুগের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ গণিতবিদ হয়েছিলেন। বিশিষ্ট ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ পামেলা রবিনসনের নেতৃত্বে ভূতত্ত্ববিভাগ শুরু হয় জীবাশ্মবিদ্যা গবেষণায় বিশেষ সাফল্যলাভ করে। তাঁর নেতৃত্বাধীন গবেষকদলই ভারতবর্ষে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডাইনোসোর জীবাশ্ম উদ্ধার করে। এডুইন হার্পার সাইকোমেট্রি শাখার প্রধান হন। যুগোস্লাভিয়া থেকে এসে ডি কোস্টিক ফোনেটিক্স বিভাগ খোলেন। এক সঙ্গে এতজন বিখ্যাত বিদেশী বিজ্ঞানীর একটি দেশী প্রতিষ্ঠানে কাজ করা একরকম অবিশ্বাস্য। আর বিজ্ঞানের এতগুলি শাখায় উৎসাহ দেওয়া মহলানবীশের বিস্তৃত চিন্তাধারা অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক। এই সূত্রে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠান চালানো স্বশাসন নিয়ে তৎকালীন ভারত সরকারের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধও হয়েছিল। সরকারের বক্তব্য ছিল সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আই এস আই এর কেবলমাত্র সংখ্যাতাত্ত্বিক গবেষণাতেই জোর দেওয়া উচিৎ। মহলানবীশের মত ছিল সংখ্যাতাত্ত্বিক গবেষণার পরিসর অনেক বড়। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সরতে হলে তিনি নির্দেশকের পদ ছেড়ে দিয়ে নতুন সংস্থা গড়বেন। সরকার মহলানবীশের মত মেনে নেন।

 

মহলানবীশের সময় আই এস আই সারা পৃথিবীতে কতটা গুরুত্ব পেত সেটা কারা সেসময় আই এস আই এসেছিলেন দেখলেই বোঝা যায়। ফিশার মোট চারবার আই এস আই এসেছিলেন ১৯৬২ সালে ফিশারের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁদের যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল। বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ ও গণিতবিদদের মধ্যে আর যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা হলেন ডব্লু ডেমিং, ওয়াল্টার শুয়ার্ট,  উইলিয়াম হারউইটজ, ফ্র্যাঙ্ক ইয়েটস, জের্জি নেম্যান, আব্রাহাম ওয়াল্ডহ্যারল্ড হোটেলিং, জি কিটাগাওয়া, টি তাগিউচি, এন কল্মোগোরভ, নর্বার্ট ভিনার, ইউ ভি লিনিক জে এল ডুব প্রমুখ। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার বিশিষ্টদের মধ্যে এসেছিলেন নিলস বোর, ফ্রেডেরিক আইরিন জোলিএ কুরি, জে ডি বার্নাল, আর্থার লিন্ডার ইয়ান টিনবের্খেন। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে মেঘনাদ সাহা সত্যেন্দ্রনাথ বসু  আই এস আই এর উপদেষ্টা হিতাকাংক্ষী ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু আই এস আই এর প্রেসিডেন্টও ছিলেন আট বছর। ছাড়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা বিভিন্ন সময়ে আই এস আই তে এসেছেন মহলানবীশের আমন্ত্রণে, যেমন চৌ এন লাই, হো চি মিন, আর্নেস্টো চে গ্বেভারা, আলেক্সি কোসিগিন লিন্ডন জনসন। চৌ এন লাই মহলানবীশকে চীনের সরকারি পরিসংখ্যান পরিচালনায় সাহায্য করারও অনুরোধ জানান। বলা বাহুল্য, মহলানবীশের প্রবল ব্যক্তিত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা আন্তর্জাতিক খ্যাতি ছাড়া এতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আই এস আই সম্পর্কে উৎসাহী করা সম্ভব ছিল না। মহলানবীশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি যেমন অনন্য ছিল, তেমন ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক ভূমিকা দায়বদ্ধতা। মূলতঃ আফ্রিকা এশিয়ার বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের সরকারি পরিসংখ্যান পরিচালনায় সাহায্য করার জন্য তিনি আই এস আই এর মধ্যে ইন্টারন্যাশানাল স্ট্যাটিস্টিকাল এডুকেশন সেন্টার গঠন করেন, যা এখনও সেইসব দেশের সরকারি কর্মীদের পরিসংখ্যানবিদ্যায় তালিম দেয়। একটি সদ্য স্বাধীন হওয়া উন্নয়নশীল দেশের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্যান্য দেশে শিক্ষার প্রসারে নেতৃত্ব দিচ্ছে, এমন নজির সারা পৃথিবীতে দুর্লভ।

 

ভারতবর্ষের উন্নয়নে মহলানবীশের আর এক বিশাল অবদান দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দেওয়া। জহরলাল নেহরু তাঁকে ব্যাপারে ব্যক্তিগত অনুরোধ করেছিলেন। মহলানবীশের অর্থনীতিতে প্রথাগত শিক্ষা ছিল না। তাতে তাঁর চিন্তাধারায় কিছুটা প্রথাবিরোধিতা ছিল, যাতে হয়তো সুবিধাই হয়েছে নতুন চিন্তাভাবনা করতে। সমস্যার সমাধানে তিনি কিছু সহজ গাণিতিক কাঠামো প্রস্তাব করেন। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় তিনি পরিকাঠামো ভারী শিল্পে জোর দিয়েছিলেন, কৃষিকে সাময়িকভাবে কিছুটা কম অগ্রাধিকার দিয়ে। মহলানবীশ পরিকল্পিত অর্থনীতি বৃহৎ সরকারি বিনিয়োগের পক্ষপাতী ছিলেন। এই সময় ভিলাই, দুর্গাপুর, রৌরকেল্লা ইত্যাদি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে ওঠে যা স্বাধীনতোত্তর ভারতের অর্থনীতির বুনিয়াদ গড়ে তাকে  স্বাবলম্বী করে তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিকল্পিত অর্থনীতির সাফল্য নিঃসন্দেহে তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অর্থনৈতিক উদারীকরণের আগে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার খুব বেশী না হলেও ভারতবর্ষে  কখনও তেমন কোনও অর্থনৈতিক সংকট না হওয়ার কারণ এই শক্ত বুনিয়াদ। পক্ষান্তরে  উপনিবেশিক শাসন থেকে ওই সময় মুক্ত হওয়া বহু দেশ তুলনায় অবস্থাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও একের পর এক সংকটের মধ্যে দিয়ে গেছে অপ্রস্তুত অবস্থায় বাজার অর্থনীতির পথ নিয়ে।

 

ভারতবর্ষে বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে, বিশেষতঃ পরিসংখ্যানবিদ্যার চর্চায় আই এস আইএর কাজকর্মের বাইরেও মহলানবীশ বিশেষ ভূমিকা নেন। ১৯৩৮ সালে ভারতবর্ষে প্রথম পরিসংখ্যানবিদ্যার উপর সম্মেলন হয়।  স্যার রনাল্ড ফিশার সেই অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানবিদ্যায় স্নাতক স্নাতকোত্তর উপাধি দেওয়া শুরু হয় ১৯৪১ সাল থেকে। মহলানবীশ তখন সেখানে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলেন। লক্ষ্যণীয়, তখন পৃথিবীর প্রায় কোথাওই আলাদা পরিসংখ্যানবিদ্যার বিভাগ ছিল না। তাঁর চেষ্টায় ১৯৪২ সালে পরিসংখ্যানবিদ্যা ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের অধিবেশনে অন্তর্ভুক্ত হয় গণিতের শাখা হিসেবে। ১৯৪৫ সালেই তা পৃথক শাখার মর্যাদা লাভ করে। তাঁর মত ছিল দেশের উন্নতিতে বিজ্ঞানচর্চা এক অপরিহার্য শর্ত এবং তার জন্য সরকারি ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আর দেশের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিবিদদের মতমত নেওয়া প্রয়োজন। ১৯৬১ সালে ভারতবর্ষের সরকারি পরিসংখ্যানের কাজের জন্য ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল সার্ভিস শুরু করা হয়।

 

সারা জীবনে মহলানবীশ নানা সরকারি  শিক্ষাক্ষেত্রে দায়িত্ব সামলেছেন, অনেক সময় একসাথে বহু দায়িত্ব, যথা আই এস আই এর নির্দেশক (১৯৩১--১৯৭২), সংখ্যার সম্পাদক (১৯৩৩--১৯৭২), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানবিদ্যার প্রধান (১৯৪১--১৯৪৫) প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা  ছাড়াও অধ্যক্ষ পদেও ছিলেন কিছুদিন (১৯৪৫--১৯৪৮) ছাড়া কলকাতায় পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বে থাকা আবহবিদ (১৯২২--১৯২৬), বাংলা ভারত সরকারের উপদেষ্টা (১৯৪৫--১৯৪৮, ১৯৪৯--১৯৭২), পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (১৯৫৫--১৯৬৭), দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রধান (১৯৫৩--১৯৫৮), ন্যাশানাল সাম্পেল সার্ভের প্রধান (১৯৫০--১৯৭২), বিশ্বভারতীর কর্মসচিব (১৯২১--১৯৩১) ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেছেন। একসাথে এতগুলি প্রতিষ্ঠান পদের দায়িত্ব পালন করার দৃষ্টান্তও সারা পৃথিবীতে খুব কম আছে। ১৯৫১ সালে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা দফতরের অধীনে সেন্ট্রাল স্ট্যাটিস্টিকাল অর্গ্যানাইজেশন গঠনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। বেকারি ছিল দেশের এক প্রধান সমস্যা। বেকারির সমাধানে মহলানবীশ প্রস্তাবিত লেবার রিসার্ভ সার্ভিস নামক একটি নীতি কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করে। কর্মক্ষেত্রে কোনও ছাঁটাই হলে কোম্পানিদের লেবার রিসার্ভ সার্ভিসে কিছু টাকা জমা দিতে হত, ফলে কোম্পানিগুলি ছাঁটাইয়ের পথে যেত তখনই যদি এর ফলে তাদের লাভ জমা দেওয়া টাকার থেকে বেশী হত। জমার টাকা থেকে লেবার রিজার্ভ সার্ভিস ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিত, যাতে তারা আবার চাকরি পাবার উপযুক্ত হতে পারে। ট্রেনিং এর সময় সেইসব কর্মীদের টাকাও দেওয়া হত, তবে পূর্ণ  কর্মসংস্থানের থেকে কিছুটা কম হারে। ফলে তাদেরও উৎসাহ থাকত স্বাভাবিক চাকরিতে ফেরত যাবার। মহলানবীশের এই মডেলে যেমন বেকারি প্রতিরোধে কিছুটা পরিসর থাকত, তেমনি অর্থনীতির প্রসারের সাথে দক্ষ কর্মীর অভাবের সমস্যা কমানো যেত।

 

পরিসংখ্যানবিদ্যার বাইরেও মহলানবীশের বিস্তৃতক্ষেত্রে আগ্রহ ছিল। তাঁর জীবনে পারিবারিক ঐতিহ্য, উদারতা শিক্ষার অপরিসীম ভূমিকা ছিল। প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁর কাজে প্রগতিশীল মনোভাব প্রকাশ পেত। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদ করতেও তিনি পিছপা হতেন না। যৌবনকালে তিনি ব্রাহ্মসমাজে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ব্রাহ্মসমাজের সহকারি সচিব, কোষাধ্যক্ষ সবশেষে সভাপতিও হয়েছিলেন। হিন্দুসমাজের তুলনায় প্রগতিশীল হওয়া সত্বেও ব্রাহ্মসমাজেও গোঁড়ামি ছিল। ব্রাহ্মসমাজের সংস্কার রবীন্দ্রনাথের উদারপন্থী চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি লড়াই করেছিলেন। সেখানে তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়। তাঁরা দুজনে মিলে "কেন রবীন্দ্রনাথকে চাই?" পুস্তিকা রচনা করে রবীন্দ্রনাথকে ব্রাহ্মসমাজের  নেতৃত্বে আনার চেষ্টা করেছিলেন। ব্রাহ্মদের হিন্দুবিবাহমতে রেজিস্ট্রেশন করার ব্যাপারেও তিনি আপত্তি জানান। এমনকি এজন্য নিজের বিবাহের সময়ও তাঁর ভাবী শ্বশুরমশাই সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে। হেরম্বচন্দ্রের কন্যা নির্মলকুমারীকে (রানী) মহলানবীশ বিবাহ করতে চাইলে হেরম্বচন্দ্র সেই কারণে গররাজি হন। মহলানবীশের নিজের বাড়ির লোকেও এই বিবাহে অংশ নেন নি, যদিও কোনও বাধাও দেন নি তাঁরা। মামা নীলরতন সরকার তাঁর বিবাহ দেন নির্মলকুমারীর সাথে। এর কিছুদিনের মধ্যেই মহলানবীশ "ব্রাহ্মবিবাহ বিধি" বলে একটি বই লেখেন, যা ব্রাহ্ম আচারের একটা প্রামাণ্য বই।

 

মহলানবীশ রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহের পাত্র ছিলেন। তাঁর বিবাহে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন "বসন্ত" নাটকটি লিখে নবদম্পতিকে উপহার দিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগে বহু নিরস্ত্র মানুষের উপর ব্রিটিশ সরকারের গুলিচালনা হত্যাকান্ডের পর কবি অত্যন্ত মনোকষ্টে ছিলেন। এই বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিবাদ করে তিনি তাঁকে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করেন। সেইসময় তাঁর এই প্রতিবাদে গান্ধিজী কংগ্রেসের উচ্চস্থানীয় নেতৃত্বকে তেমনভাবে পাশে না পেয়ে কবি মর্মাহত হয়েছিলেন। মহলানবীশ সেই সময় রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ মানসিক সাহচর্য দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর সচিব হিসেবে মহলানবীশ বহুদিন কাজ করেছেন। কবি নিজেও মাঝে মাঝে  প্রেসিডেন্সির গবেষণাগার পরিদর্শনে  আসতেন খোঁজখবর নিতেন। ১৯৪১ সালে বরাহনগরে মহলানবীশ আমগাছে ছাওয়া যে বাগানবাড়ি কিনেছিলেন, পরে যার লাগোয়া জমিতে আই এস আই এর নতুন বিদ্যায়তন গড়ে ওঠে, রবীন্দ্রনাথ তার নামকরণ করেছিলেন "আম্রপালি" রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর চিন্তাভাবনা খুব মিলত। তাঁরা দুজনেই মনে করতেন ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাঁরা দুজনেই জাতীয়তাবাদের প্রচলিত রূপ সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন, কারণ তা যে উপনিবেশিকতার বিরোধিতা করে, প্রকারান্তরে তাকেই সে অনুকরণ করে। মহলানবীশও রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী ছিলেন বিশ্বশান্তির জন্য কাজ করেছিলেন। মহলানবীশের উদ্যোগে আই এস আই তাঁর বাসস্থান গুপ্তনিবাসে রবীন্দ্রনাথ অতিথি হয়েছিলেন নেহরুর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। "জনগণমন" কে জাতীয় সঙ্গীত করার প্রস্তাব নেহরু তখনই তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

 

তবে প্রথাগত জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হলেও মহলানবীশের দেশের মানুষের জন্য বিশেষ অনুভুতি ছিল। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি বর্মায় ব্রিটিশ শক্তির পতন হলে সৈন্যদের খোরাকির উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার বাংলা থেকে চাল অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে নেয় ন্যূন্যতম বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই। চালের দাম হুহু করে বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কালোবাজারি মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকার কোনও ব্যবস্থা নেয় না। বার বার দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদী ভারতবিদ্বেষী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল কান দেন নি। কুড়ি থেকে তিরিশ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায় বাংলায় মানুষের তৈরি এই কৃত্রিম অন্নাভাবে, যা সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব ছিল।  নৃতত্ত্ববিদ কে পি চট্টোপাধ্যায়ের অনুরোধে মহলানবীশ একটি রিপোর্ট গবেষণাপত্র লেখেন লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটিতে আর্ল অফ মুন্সটারের সামনে পাঠ করেন। তথ্য সহযোগে তিনি এই দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেন কারুকে সরাসরি দোষারোপ না করেই। ব্রিটিশ সরকারের এই অমানবিক দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতির বিরুদ্ধে ব্রিটেনেই যথেষ্ট জনমত গড়ে ওঠে, যাতে মহলানবীশের রিপোর্টের বিশেষ ভূমিকা ছিল। স্ত্রী রানী মহলানবীশের সাথে স্বাধীনতার পরে পূর্বপাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে তিনি কল্যানশ্রী প্রকল্প চালু করেছিলেন। এতে উদ্বাস্তু পরিবারের সদস্যদের হাতের কাজ শেখানো হত স্বনির্ভর হবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।

 

মহলানবীশ কখনও সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন নি বা কোনও রাজনৈতিক বক্তব্যও রাখেন নি কখনও। তবে তাঁর চিন্তাধারা যে অনেকটাই বামপন্থী আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে করা তাঁর প্রস্তাবগুলি অনেকাংশেই সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে করা। আর পারিবারিক সূত্রে তিনি পেয়েছিলেন মানবিকতা উদারপন্থী চিন্তাধারা।

 

 বাংলা ভাষা সংস্কৃতির প্রতিও মহলানবীশের বিশেষ টান ছিল। রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে আসা নিজের লেখালিখি (ব্রাহ্মসমাজ রবীন্দ্রনাথের উপরে) ছাড়াও কেম্ব্রিজে থাকার সময় মহলানবীশের উদ্যোগে বাংলা ভাষা চর্চার একটা সমিতি করা হয়েছিল যা নিয়মিতভাবে মিলিত হত সংস্কৃতি চর্চা করত। এই সমিতিতে বাংলায় কথা বলা বাধ্যতামূলক ছিল --- ইংরাজি ভাষা ব্যবহার করলে জরিমানা নেওয়া হত। সেই যুগে, যখন শিক্ষিত বাঙালি প্রায়ই ইংরেজের অন্ধ অনুকরণ করত, তখন ধরণের উদ্যোগ অভাবনীয়। এমনকি যুগেও, যখন বাংলার চর্চা সংকুচিত হচ্ছে, মহলানবীশের বাংলা ভাষা চর্চার উদ্যোগ স্মরণীয়।

 

উত্তরাধিকারসূত্রে মহলানবীশ রক্তে উদ্যোগপতিত্ব পেয়েছিলেন। সংখ্যা পত্রিকার ছাপা তখন কলকাতায় যে মানের হত, মহলানবীশের সেটা পছন্দ ছিল না। সংখ্যা ভালভাবে ছাপানোর জন্য তিনি তাঁর কলকাতার বাড়িতে একা প্রেসের প্রতিষ্ঠা করেন, যার দেখাশুনো তিনি নিজেই করতেন। পরে তা  পরিসংখ্যানবিদ্যা সংক্রান্ত বই ছাপানোর জন্যও ব্যবহার হয় এবং স্ট্যাটিস্টিকাল পাবলিশিং সোসাইটি নামে খ্যাত হয়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে একটি উন্নতমানের ছাপার যন্ত্র উপহার পেলে তিনি ত্রৈকা প্রেসের প্রতিষ্ঠা করেন, যার অর্ধেক কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশিত বিজ্ঞানের বইগুলির ইংরাজী অনুবাদ ছাপানো। এমনকি মহলানবীশ আই এস আই বানিজ্যিকভাবে যন্ত্রগণক  তৈরি করারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যদিও সে চেষ্টা ফলপ্রসু হয় নি। এটি হয়তো মহলানবীশের একমাত্র উদ্যোগক্ষেত্রে ব্যর্থতার উদাহরণ। তবে ব্যর্থতা সত্ত্বেও এতেও মহলানবীশের পারিবারিক ব্যবসার ঐতিহ্য উদ্যোগপতির গুণ লক্ষ্য করা যায়।

 

সারা জীবনে মহলানবীশ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে অসংখ্য সম্মান পেয়েছেন, যেমন ফেলো অফ দি ন্যাশানাল  সায়েন্স অ্যাকাডেমি (১৯৩৫), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েল্ডন গোল্ড মেডাল (১৯৪৪), লন্ডন রয়্যাল সোসাইটির ফেলো (১৯৪৫), ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি (১৯৫০),মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইকনমেট্রিক সোসাইটির ফেলো (১৯৫১), পাকিস্তান স্ট্যাটিস্টিকাল আসোসিয়েসনের ফেলো (১৯৫২), রয়্যাল সোসাইটির সাম্মানিক ফেলো (১৯৫৪), কেম্ব্রিজ কিংস কলেজের ফেলো (১৯৫৯), ইন্টারন্যাশানাল স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিটিউটের সাম্মানিক সভাপতি (১৯৫৭), দেবীপ্রসাদ সর্বাধিকারি গোল্ড মেডাল (১৯৫৭), সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যাকাডেমি অফ সাইন্সের বিদেশী সদস্য (১৯৫৮), আমেরিকান স্ট্যাটিস্টিকাল আসোসিয়েসনের ফেলো (১৯৬১), দুর্গাপ্রসাদ খৈতান গোল্ড মেডাল (১৯৬১), ফেলো অফ দি ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ সাইন্স (১৯৬৩), চেকোস্লোভাক অ্যাকাডেমি অফ সাইন্সেস গোল্ড মেডাল (১৯৬৩), শ্রীনিবাস রামানুজান গোল্ড মেডাল (১৯৬৮) ছাড়া তিনি পদ্মবিভূষণ দেশিকোত্তম সম্মান পান বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট হয়েছিলেন। বিশ্বব্যপী ঠান্ডা যুদ্ধের সেই কালে তিনি মুষ্টিমেয় কয়েকজন বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন যাঁরা বিশ্বের সর্বত্র আদরণীয় ছিলেন।

 

মহলানবীশ সম্পর্কে কিছু লিখতে হলে তাঁর স্ত্রী রানী মহলানবীশ সম্পর্কে কিছু না লিখলে লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। রানী অত্যন্ত রুচিশীলা বিদুষী মহিলা মহলানবীশের যোগ্য সহধর্মিনী ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের উপর "বাইশে শ্রাবণ" নামক একটি বই লিখেছিলেন কবির সাথের তাঁর ব্যক্তিগত আদানপ্রদানের স্মৃতি থেকে। স্বামীর সাথে রানীও নানা সমাজকল্যানের কাজে অংশ নিতেন। আই এস আই এর কাজকর্মে রানীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। আই এস আই এর অতিথিনিবাস আম্রপালি তিনি নিজের মনের মত করে সাজিয়েছিলেন। আই এস আই প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখা সৌন্দর্যায়নে তাঁদের দুজনেরই বিশেষ নজর ছিল। আই এস আই প্রত্যেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব যারা পদার্পন করেছিলেন, মহলানবীশ দম্পতির আগ্রহে প্রত্যেকে বৃক্ষরোপণে অংশ নিয়েছিলেন। কর্মীদের কাছেও এই বৃক্ষরোপণ স্মরণীয় উৎসব ছিল। নিঃসন্তান এই দম্পতির কাছে আই এস আই এর ছাত্র কর্মীরাই সন্তানের তুল্য ছিল। তারাও মহলানবীশ দম্পতিকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন। আই এস আই তে বহু অধ্যাপক থাকলেও প্রফেসর বলতে তখন শুধু মহলানবীশকেই বোঝাত। মহলানবীশ দম্পতির প্রতিষ্ঠিত আই এস আই ক্লাব এখনও ছাত্র কর্মীদের সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র। মহলানবীশের জন্মদিন ২৯শে জুন এখনও প্রতিবছর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন হয়, যেখানে স্থায়ী-অস্থায়ী সমস্ত কর্মী ছাত্ররা একসাথে মধ্যাহ্ণভোজ করেন।

 

সবশেষে মহলানবীশের নিজের বলা কথা দিয়ে শেষ করতে হয়। তিনি বলতেন যে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গবেষণার সবসময় একটা উদ্দেশ্য থাকতে হবে। সারা জীবন তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি তা বুঝিয়েছেন। তিনি পরিসংখ্যানবিদ্যাকে শুধুমাত্র সম্ভাবনাতত্ত্বভিত্তিক নিয়মমাফিক তথ্যের বিশ্লেষণ কিংবা নিছক সরকারি সিদ্ধান্ত নেবার সহায়ক বলে মনে করেন নি। তিনি একে একটা সর্বব্যাপী স্বাভাবিক তথ্যভিত্তিক জ্ঞান আরোহনের বিজ্ঞান হিসেবে দেখেছিলেন, যা কি না শেষমেষ মানবকল্যাণের নানা কাজে ব্যবহার হবে। মহলানবীশের অন্তর্দৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া যায় আজ জীবনের প্রায় সব ব্যাপারেই পরিসংখ্যানবিদ্যার প্রয়োগে। মহলানবীশের সফল নেতৃত্বে বা তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলিতে কাজ করে বা প্রশিক্ষণ পেয়ে আরও অনেকে বহু নজরকাড়া গবেষণা করেছেন করছেন। মহলানবীশ গবেষক অশোক রুদ্রের ভাষায়, মহলানবীশ হলেন ইতিহাসের এক বিরল অসাধারণত্ব। উন্নত দেশে সাধারনতঃ সংস্থা থাকে, ব্যক্তি সেই পরিকাঠামো ব্যবহার করে তাকে দক্ষভাবে পরিচালনা করেন। ভারতবর্ষের মতো উন্নয়নশীল দেশে দৃষ্টান্তকর কিছু করতে হলে  ব্যক্তির উদ্যোগকে অনেক বড় হতে হয়। মহলানবীশ ছিলেন সেই উদ্যোগীর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

 

 ----------------------------------

প্রবন্ধটি ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ’ প্রকাশিত ‘তিন বাঙালি বিজ্ঞানী’ বইয়ে আমার একটি প্রবন্ধের সংক্ষিপ্তরূপ। 


জুন ২০২০

কপিরাইটঃ শুভাশিস ঘোষাল

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

শেফালীর সেলফি

শেফালীর সেলফি

-শুভাশিস ঘোষাল

 

শেফালী একজন ফেলিব্রিটি। ফেসবুকে তার হাজার দশেক ফ্রেন্ড-ফলোয়ার। প্রতিদিন সে দশ-বারোটা সেলফি অন্ততঃ পোস্ট করে ফেসবুকে। তাতে তিন-চার হাজার করে লাইক পড়ে। শ’পাঁচেকের উপর কমেন্ট। প্রতিটি কমেন্টের উত্তরে সে নিজে কিছু লেখে, বা অন্ততঃ রিয়্যাক্ট করে ইমোজি দেয়।

আমি শেফালীর একনম্বর ফেসবুক ফ্যান ছিলাম। কেন, কি করে আর এখন কেন আর নেই, সে কথা বলার জন্যই তো এই লেখা।

শেফালী আমাদের শহরেই থাকে। বাঙালিদের উইকএন্ডে পার্টি লেগেই থাকে। কারুর একটা বাড়িতে অনেকগুলো ফ্যামিলি জড়ো হয়ে আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়া। এরকম একটা পার্টিতেই শেফালীর সঙ্গে আলাপ।

শেফালী সবে তিরিশের কোঠায় পড়েছে। ছিপছিপে চেহারা, লম্বা খোলা চুল, টিকালো নাক। শিক্ষিত, স্মার্ট, বুদ্ধিমতী। আর খুব মিশুকে। প্রথম আলাপেই এমনভাবে কথা বলে যেন কতদিনের চেনা। মোটকথা খুবই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।

জানি, শেফালী নাম শুনে সেরকম সুন্দর কোনও ছবি ফুটে উঠছে না, তাই তো? শেফালী নামটা আমাদের মা-মাসীদের প্রজন্মে রাখা হত, এখন চলে গরীবদের মধ্যে। তবে শেফালী প্রবাসে বড় হয়েছে, ওখানে বোধ হয় আধুনিক নামের ঢেউটা দেরিতে পৌঁছায়। আর দাদু-দিদিমা বা বয়স্ক কেউ কেউ অনেকসময় ওরকম নাম দিয়ে দেয়, তখন তাদের সম্মানে সেই নামটাই শেষে রাখতে হয়। কিন্তু নাম শুনে কি সব সময় বোঝা যায়? আমার এক কাজিনের নাম তো ব্রজগোপাল, অথচ সে বেশ আধুনিক ছোকরা। আর আমার এক তালেবর ক্লাশমেট ছিল তারিণী নামে। একটা হিন্দী সিনেমাতেও দেখেছিলাম, পুলিস ইন্সপেক্টর অক্ষয়কুমার তদন্তে গেছে একটা ফোন পেয়ে। ফোনটা করেছে মহালক্ষ্মী নামে কেউ। অক্ষয়কুমার তো ভেবেছে কোনও বৃদ্ধা হবে, ঢোকার গেটের মুখে সেরকমই একজন দাঁড়িয়ে। কিন্তু দেখা গেল সে নয়, মহালক্ষ্মী হল ঐশ্বর্য রাই। গেটের সেই বৃদ্ধার বরঞ্চ অনেক আধুনিক নাম। 

যা হোক, সেসব অবান্তর কথায় কাজ নেই। শেফালী যথেষ্ট আকর্ষণীয়া, ওর সাথে আলাপ হলে খুশি হবার যথেষ্ট কারণ আছে। শেফালী অবশ্য বেশি পরিচিত শেলী নামে। লেখার সময় শেফালী বলে লিখছি বটে, তবে আমরা সম্বোধন করার সময় শেলী বলেই ডাকি। এখানে এরকম অনেকেই নিজের নামটা ওয়েস্টার্নাইজ করে নেয়। তাতে রণজয় হয়ে যায় রন, তিমির হয়ে যায় টিম, অনিন্দিতা হয় অ্যানি। ষাটের দশকে এ দেশে এসেছিলেন মোক্ষদাচরণ, আমাদের বাঙালি কম্যুনিটির একজন প্রবীণতম সদস্য, তিনি পরিচয় দেন ম্যাক্স নামে।

এখানে বাঙালিদের পার্টিগুলোয় আড্ডা মারার সময় ছেলেরা আর মেয়েরা বেশিরভাগ সময় আলাদা জায়গায় জমায়েত হয়। নিজেদের মধ্যে আড্ডা মারে। তবে কম লোকের পার্টি হলে তা হয় না, একসাথেই আড্ডা চলে। সেদিনের পার্টিটা সেরকমই ছিল। তার ফলে আর শেফালীর খুব মিশুকে ব্যক্তিত্বের গুণে সেদিনের আড্ডাটা খুবই জমেছিল। প্রথম আলাপ বলেই মনেই হল না। ওর বর অত্রিও বেশ চমৎকার ছেলে, কথা বলে আনন্দ আছে। একটা চমৎকার আমেজ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম সে রাতে।

বাড়ি পৌঁছে ফেসবুকে খুলেই দেখি শেফালীর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। কি আনন্দ! ‘হৃদি ভেসে গেল অলোকানন্দা জলে’। সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাকসেপ্ট করে নিই। সে দিনই গোটা কুড়িক ছবি পোস্ট করেছে। কয়েকটা সেদিনের পার্টিরও। কয়েকটা ছবিতে লাইকও মেরে দিলাম। প্রচুর লাইক আর কমেন্ট ছবিগুলোয়। তখন থেকেই শেফালীর ফেলিব্রিটি স্ট্যাটাসের কথা জানতে পারলাম।

কিন্তু ফেসবুকে ওর অত পপুলারিটি কী জন্য? শেফালী ফিল্মের নায়িকা বা ওরকম কোনও সেলিব্রিটি নয়। সুন্দরী বটে, তবে সুন্দরীর তো অভাব নেই, আমাদের কম্যুনিটিতেই অনেকে আছে, কয়েকজন আবার ওর থেকে বেশিই সুন্দরী হবে। বাঙালি অ্যাসোসিয়েসনের নাটকে অভিনয় ভালই করে ও, তবে সে তো অ্যামেচার ব্যাপার। অল্প-স্বল্প নাচ-গান হয়তো পারে, তা সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু তো নয়। লেখা টেখারও ব্যাপারে নেই ও। ব্যক্তিত্ব অবশ্যই একটা ব্যাপার, তবে মনে হয় কিছু মানুষ স্রেফ বিখ্যাত বলেই বিখ্যাত হয়। শেফালীও সেরকম হবে।

এর কিছুদিন পর আর একটা পার্টিতে আবিরের সঙ্গে দেখা। আবির আমার থেকে বছর দশেকের ছোট হবে। প্রায়ই পার্টিতে দেখা হয়। ওর সাথে গুলতানিটা ভালো জমে। ঘরে সিগারেট খাওয়া যায় না বলে বাইরে গিয়ে খেতে হয়। স্মোকাররা এরকম তিন-চার জনের দলে বেরোয় মাঝে মাঝে। তখন আরও কিছু এক্সক্লুসিভ আড্ডা চলে যেটা সর্বসমক্ষে একটু অসুবিধার। সেই সূত্রেই আবিরের সঙ্গে দোস্তি। কয়েকবছর আগে আমি  সিগারেট ছেড়ে দিলেও বাড়তি আড্ডার আকর্ষণটার জন্য ওদের দলের সঙ্গে বাইরে যাই মাঝে মাঝে। সেদিন অবশ্য স্মোকার আবির একাই। বলল, “সুমিতদা, চলো একটু বাইরে ঘুরে আসি।“

“চল”, বলে বেরোলাম ওর সাথে।

একটা সিগারেট ধরিয়ে আবির বলল, “তোমার ফ্রেন্ড লিস্টে শেফালী আছে দেখলাম।“

আমি বললাম, “হ্যাঁ, এই কদিন আগে ও রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল, তখন থেকেই।“

-“বা, তা ভালো, কিন্তু কমেন্ট কিছু করছ না কেন?”

আবির প্রচুর কমেন্ট করে শেফালীর ছবি পোস্টে, লক্ষ্য করেছি। প্রায় ফ্লার্ট করে বলা যায়।

-“কমেন্ট আর কী করব? আর পোস্টও তো করে অনেক। যতগুলো পারি লাইক তো দিই, কয়েকটা হয়তো বাদ পড়ে যায়।“

-“একটা দায়সারা লাইক মারলেই হল? ভালো কিছু কমেন্ট না করলে ওর খারাপ লাগবে না, বিশেষ করে তোমাকে নিজে রিকোয়েস্ট দিয়েছে? ভাববে ওর অ্যাপিল বুঝি কম হয়ে গেল। একজন সুন্দরী মেয়ের সম্মান রাখতে হবে না? জানো, কত লোকে ফ্রেন্ড হতে চেয়েও পায় নি?”

-“এত ফলোয়ারের ভিড়ে আমার কমেন্টের আর আলাদা করে কি মূল্য আছে? ‘বাগান কি তার প্রতিটি গাছ চেনে?’ আর আমার এখন পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই, এই বয়সে তোর মতো ওরকম ফ্লার্ট করব বুঝি? আমার থেকে প্রায় বছর কুড়ির ছোট হবে।“

-“এটা কী বলছো? একজন ফলোয়ারই বা কমেন্ট দিতে কার্পণ্য করবে কেন? কত ভালো ভালো কথা লেখা যায়। অরুণ মেসোকে দেখোনি? আরে, অর্ণার বাবা, গত সামারে এসেছিলেন এখানে। কত কমেন্ট দেন শেফালীর প্রতিটা পোস্টে। ওনার তো অন্ততঃ পঁয়ষট্টি বছর বয়েস হবে। তাহলে তুমি কে যে পারবে না?”

হ্যাঁ, দেখেছি বটে অর্ণার বাবা বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে কমেন্ট করে থাকেন। রিটায়ার্ড মানুষ, এইসব করেই সময় কাটান বোধ হয়।

বললাম, “আচ্ছা, তুই যে এরকম ফ্লার্ট করিস, তোর বউ রাগ করে না?”

-“ফ্লার্ট কোথায়, অ্যাডমায়ার করি। যার যা সম্মান, তাকে তো তা দিতেই হবে। আর শ্রেয়শী রাগ করবেই বা কেন? ওর পোস্টেও তো কত কমেন্ট দেয় লোকে? আমি কি তাই নিয়ে কখনও বলতে গেছি?”

আবিরের বউ শ্রেয়শী অবশ্য রান্নার স্পেশালিস্ট। নানারকম খাবার বানায় আর নিজের সঙ্গে তার ছবি ফেসবুকে পোস্টায়। ইউটিউবে রান্নাবান্নার একটা চ্যানেলও খুলেছে। 

-“আচ্ছা, সে না হয় হল, কিন্তু তুই যেরকম লিখিস, তাতে অত্রিও চটে যেতে পারে তুই ওর বউএর সাথে ফ্লার্ট করছিস বলে।“

-“আরে ধুর, আমি ওর বউএর অ্যাডমায়ার করছি, তাতে তো ও আরও খুশি হবে এই ভেবে যে ওর বউ রিয়েলি একটা জুয়েল। তোমাদের জেনারেশনটা এতো সেকেলে চিন্তাভাবনায় চলে যে কী বলব! শেফালীকে তোমার আমার সকলেরই ভালো লাগে। তা লাগে যখন, সেটা বললেই দোষ? তুমিও কমেন্ট করে দেখ না, অত্রি তো নয়ই, বউদিও কিছু মনে করবে না। আর তুমি আমি তো প্রেমিক নই, অ্যাডমায়ার। ফেমাসদের ওসব প্রেমিক-টেমিকের ব্যাপার থাকে না। জানো তো, ‘যতো বুঁচি ক্ষেদি নয়, মন্দিরা বেদি আর মাধুরী দীক্ষিতের প্রেমিক থাকেনা’। এসব ব্যাপারে শেফালী খুব স্ট্রিক্ট, নো লাইন ক্রশিং।”

আবির চন্দ্রবিন্দু থেকে কোটেশন ঝাড়ে।

ভাবলাম, ব্যাটা, তুই আমার থেকে মাত্র দশবছরের ছোট, তাতে একেবারে আলাদা জেনারেশন হয়ে গেলি? তুইও তো চল্লিশে পড়লি।

জিজ্ঞাসা করি, “আচ্ছা, শেফালীর পোস্টে এত লাইক আর কমেন্ট পড়ে কেন বল তো? সুন্দরী ঠিকই, তবে ও তো আর মডেল বা ফিল্ম আর্টিস্ট নয়। সিঙ্গার বা রাইটারও নয়। একরকম আমাদের মতো সাধারণই বটে।“

আবির বলে, “দেখো সুমিতদা, শেফালী যে এত লাইক আর কমেন্ট পায়, তার জন্য ওর সাধনাটা কেউ খেয়াল করে না। প্রত্যেক ফ্রেন্ডের কমেন্টে ও ইমোজি তো দেয়ই, উত্তরও দেয়। তারা কিছু পোস্ট করলে নিজেদের ওয়ালে, শেফালী কমেন্ট করে। প্রত্যেককে জন্মদিনে উইশ করে। পারফেক্ট ফেসবুক এটিকেট জানে আর প্রয়োগ করে। কত সময় দেয় জানো? এগুলো সাধনা নয়?”

-“কিন্তু এত সময় কী করে দেয়? এখনও বাচ্চা হয় নি বুঝলাম, কিন্তু চাকরি তো করে।”

-“এফিসিয়েন্সি, মাল্টিটাস্কিং। সন্ধেবেলায় অফিসের পরে ছবিগুলো পোস্ট করে। আর ও মেনলি বাড়ি থেকে কাজ করে। অফিসের মিটিং যখন চলে, সেই সময়ই অন্য একটা ল্যাপটপ থেকে আগের দিনের পোস্টের কমেন্টগুলোর উপর, যেগুলোর তখনও উত্তর দেওয়া হয় নি, উত্তর দেয়।“

আবিরের সঙ্গে কথা সেদিন এখানেই শেষ হল। মোটিভেটেড হলাম। সত্যিই তো, ভালো ভালো কমেন্ট করাই উচিৎ। কিন্তু কি লিখব? আর পাঁচজনে যেমন সুপার্ব, অসাম-বিউটি, হট লেখে --- এগুলোই ঘুরে ফিরে দেব? অন্যদের থেকে আলাদা, চোখে পড়ার মতো কিছু দিলে হয় না? ছোটবেলায় স্কুলে টিচাররা, বাড়িতে বাবা-মা বলতেন, যা করবে, মন দিয়ে ভালো করে করবে, পড়াশুনোই হোক, কি খেলাধুলো, আঁকা, গান-বাজনা, লেখাজোখা, অভিনয় যা হোক। ওদের কথা শুনিনি কখনও, পড়াশুনো, লেখাজোখা, খেলাধুলো সবেতেই ফাঁকিবাজি করেছি, তাই কোথাও তেমন ভালো ফল পাই নি। ফেসবুকে কমেন্ট করার ব্যাপারে ওরা অবশ্য বলেন নি কিছু, তবে তখন তো ফেসবুকই ছিল না। থাকলে নিশ্চয় একই কথা বলতেন। তা অন্ততঃ একটা ব্যাপারে নিষ্ঠার সঙ্গে সেই চেষ্টা করি না কেন?

কিন্তু কী করে আমার ভাষার দারিদ্র্য ঢাকা যায়? ভাবতে ভাবতে মনে হলো, সিচুয়েশন বুঝে কিছু বিখ্যাত কবিদের কবিতার কিছু লাইন তুলে দিলে কেমন হয়? রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, সুনীল, জয়? শেফালী অবশ্য কনভেন্টে পড়েছে, ইংরাজি কবিদের লাইন, কীটস-শেলীর মত চিরন্তন কবিদের, বা রবার্ট ফ্রস্ট, টি এস ইলিয়টের মতো আধুনিকদের লেখা থেকে তুলে দিলে হয়তো বা আরও ইম্প্যাক্ট হতো, তবে আমার বরাবর বাংলা মিডিয়ামে পড়াশুনো --- ইংরাজি সাহিত্যে একেবারেই জ্ঞান নেই। যা জানা নেই, সে চেষ্টা করে লাভ নেই। বাংলাই লিখব, শেফালীর বাংলা কবিতা কেমন লাগে জানি না, তবে বাংলা পড়তে লিখতে পারে ঠিকঠাক, জানি।   

ওইদিন শেফালীর একটা সেলফি পোস্টে সুধীন দত্তের কবিতা থেকে একটা উদ্ধৃতি দিলাম,

“কখনও কখনও মনে হয় যেন চিনি

বিদ্যুতে লেখা হেন রূপরেখা

চীনে পটে বন্দিনী।“

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শেফালী একটা লাভ ইমোজি দিল। আর উত্তরে কমেন্টও লিখল, “দারুণ হয়েছে দাদা। লাভ ইট।“

উৎসাহ পেয়ে গেলাম। সেলফির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেন্টে আমার কোটেশন চলতে থাকল সুযোগ মতো। সেদিন একটা সুন্দর কাজ করা হলুদ রঙের শাড়ি পরে একটা সেলফি পোস্ট করল। তাতে স্বাভাবিকভাবেই মনে এল রূপসী বাংলার একটা লাইন,

“সেখানে হলুদ শাড়ি লেগে থাকে রূপসীর শরীরের ‘পর—শঙ্খমালা নাম তার”

লাইনের মধ্যেই রূপের প্রশংসা করা হয়েছে, তাই আলাদা করে আর সেটা বলতেও হলো না।

তারপর একদিন শেফালীদের বাড়িতে পার্টি, ওর বাড়ির ডেকে দাঁড়িয়ে ওর কয়েকজন বান্ধবীদের সাথে একটা গ্রুপ সেলফি পোস্ট করল। শেফালী, রিনিকা, শ্রেয়শী, সুচেতনা – এরা সব আছে সেই ছবিতে, ট্যাগও করা আছে ওদের। ওরা তো শুধু সুন্দরী নয়, বুদ্ধিমতীও বটে, তাই জীবনানন্দ থেকে নিয়ে কমেন্ট করলাম

“সেইখানে যূথচারী কয়েকটি নারী,
ঘনিষ্ঠ চাঁদের নিচে চোখ আর চুলের সংকেতে মেধাবিনী।“

দেখলাম ওদের সকলেরই কথাটা খুব ভালো লেগেছে। লাভ ইমোজি দেওয়া ছাড়াও সকলেই কমেন্ট লিখেছে উত্তরে। তাই মনে হল আরও দুলাইন লিখি, বিশেষ করে ওদের বরেরাও যখন সব সফল, প্রতিষ্ঠিত, সেটাও ওদের এক শ্লাঘার বিষয়, সেকথাও বলতে হবে বই কি? তাই আরও লিখলাম

 “কয়েকটি নারী যেন ঈশ্বরীর মতো

পুরুষ তাদের ঃ কৃতকর্ম নবীন”

ওরা সবাই দারুণ খুশি। ফ্যান হিসেবে আমার ভিসিবিলিটি চড়চড় করে বেড়ে গেল।

দেখতে দেখতে চলে এল সেই বিশেষ দিন, শেফালীর জন্মদিন। ওকে সবাই প্রচুর উইশ করছে। তবে শুধু হ্যাপি বার্থ ডে বলার কোনও মানে হয় না। একটু বিশেষ করে কিছু তো লিখতে হবে। তাই রবি ঠাকুরের শরণাপন্ন হতে হল।

“জন্মের দিনে দিয়েছিল আজি তোমারে পরম মূল্য

রূপসত্তায় এলে যবে সাজি সূর্যতারার তুল্য।“

না, এর থেকে সুন্দর উইশ কেউ লেখে নি। আবির, অরুণমেসো ওদের অনেকদূরে ছাড়িয়ে আমি তখন এক নম্বর ফ্যান হয়ে উঠতে পেরেছি।

তারপর বর্ষা এসেছে। শেফালী খুব রোমান্টিক, ভিজতে ভালোবাসে। বৃষ্টিভেজা একটা অপার্থিব সেলফি পোস্ট করেছে দেখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন থেকে কমেন্টে লিখে দিলাম

“রূপালি মানবী, সন্ধ্যায় আজ শ্রাবণ ধারায়

ভিজিও না মুখ, রূপালি চক্ষু, বরং বারান্দায়

উঠে এসো।”

তার উত্তরে শেফালী হা হা ইমোজি দিয়ে প্রশ্রয়ের সুরে লিখেছে, “ইউ আর নটি”। আমিও একটা হাহা ইমোজি দিলাম।

দারুণ জমে উঠেছে খেলাটা। এবার ঝড়ের হাওয়ায় এলোচুল মেলে একটা সেলফি পোস্ট করল। দেখেই আমার মনে পড়ল কয়েকটা পংক্তি ---

“এখন অপর আলো পৃথিবীতে জ্বলে;

কি এক অপব্যয়ী অক্লান্ত আগুন!

তোমার নিবিড় কালো চুলের ভিতরে

কবেকার সমুদ্রের নুন!”

কিছুটা সন্দেহ ছিল চুলের মধ্যে নুন আছে বলাতে কেমনভাবে রিয়্যাক্ট করবে। কিন্তু দেখা গেল সেসব আশংকা অমূলক। লাইন কটা ওর খুবই পছন্দ হয়েছে। বল, “দাদা, দারুণ মিলিয়েছ।'' আমি লিখলাম, জীবনানন্দ মিলিয়েছেন। তবে মনে মনে ভাবলাম, জীবনানন্দ লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু সার্থক প্রয়োগ করেছি আমি, সেটাও কম কৃতিত্বের নয়।

এরকম করে চলতে থাকে অনেক অনেক দিন। মাঝে মাঝে শেফালীর সঙ্গে মুখোমুখি দেখাও হয় পার্টিতে। অনেক গল্প করে। ওর খুশি দেখে ভালো লাগে।

তখন শরৎ এসেছে। ঊজ্জ্বল আলোয় ভরে গেছে চারিদিক। বর্ষার শেষে সবুজের সমারোহ। লনে নিখুঁত গালিচার মতো কচি সবুজ ঘাস। বাড়ির ডেকে দাঁড়িয়ে একটা সেলফি তুলে পোস্ট করেছে শেফালী। ঠিক যেন, ‘সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর, তেমনই দেখেছি তারে’। আমি কত চেষ্টা করি আমার লনের ঘাসটা সুন্দর সবুজ রাখার, কিছুতেই পেরে উঠি না, অথচ শেফালীর লনটা কি সুন্দর। মুগ্ধ হয়ে আমি কমেন্ট করলাম, “কী অপূর্ব ঘাস তোমার লনের। কী সুন্দর মেন্টেন করো! তোমার ল্যান্ডস্কেপারের কন্ট্যাক্টটা একটু দিও।“

 শেফালীর কোনও উত্তর পেলাম না। মনমরা লাগল। আরও দুদিন গেল, শেফালীর কোনও পোস্টও আর চোখে পড়ে না ফেসবুকে। এরকম তো হয় না, শরীর খারাপ নয় তো। কিন্তু ওরকম দুম করে জিজ্ঞাসা করা যায় নাকি, “তোমার কি শরীর খারাপ? সেলফি পোস্ট করছ না কেন?”

দুদিন বাদে আর একটা পার্টিতে আবার আবিরের সঙ্গে দেখা। সিগারেট খাবার জন্য ও বেরোলে ওর সঙ্গে আবার বেরোলাম। ওকেই জিজ্ঞাসা করলাম, “হ্যাঁ রে, শেফালীর কী হয়েছে? শরীর খারাপ নাকি? ফেসবুকে আর কিছু পোস্ট করে না তো।“

আবির অবাক হয়ে বলল, “তা তো না, পোস্ট তো করছেই। কেন, তুমি পাচ্ছ না?”  

একটা আশংকা ধক করে ওঠে। মোবাইলটাতেই তখন ফেসবুক খুলি। ফ্রেন্ডলিস্ট খুঁজতে থাকি। কোথাও শেফালী নেই! কী ব্যাপার? আমাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছে। সে কী!

আবিরও আশ্চর্য হল, বলল, “তুমি তো খারাপ কথা কিছু লিখবে না। তাহলে? শেষ কমেন্ট কী লিখেছিলে মনে আছে?”

বললাম ঘটনাটা। আবির বলল, “তুমি দেখালে বটে! আক্কেল বলে কি কিছু নেই? ঘাস নিয়ে তুমি যে আদেখেলেপনা করলে না, গরুও ওরকম করে না। তা তুমি ফুল, পাখি, চাঁদ, পাহাড়, নদী, আকাশ, বাতাস, মেঘ, ঘাস, গাছ --- যার খুশি প্রশংসা করো না কেন, তা বলে শেফালীকে ইগনোর করে শুধু সেই কথাটা বলা ওর পক্ষে কত অপমানজনক ভাবো তো? বেশ তো কোটেশন ঝাড়ছিলে, নিজে লিখতে গিয়েই গন্ডগোল পাকালে।“

সত্যি খুব ভুল হয়ে গেছে, তবে শেফালী কি সেটা একটু বুঝতে পারত না? বেশ, ‘না হয় যত্ন করে ভুলেই যেও’। বুঝলাম, যে কোনও ব্যাপারেই এক নম্বর জায়গাটা ধরে রাখা কত কঠিন।


----------- 
প্রথম প্রকাশ, ফেসবুক, জুলাই ২০২০ 
কপিরাইটঃ শুভাশিস ঘোষাল